chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে হঠাৎ বন্যা: কেন এই বিপর্যয় ? 

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, উজান থেকে নেমে আসা নদীর পানি এবং বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক জোয়ার—এই চারটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে লাখো মানুষ মানবিক সংকটে পড়েছেন।

দুর্যোগের পাশাপাশি পাহাড়ধসও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, টানা বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম অঞ্চলের চার জেলায় মোট ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কেন হঠাৎ এই বন্যা ?

আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং টানা ভারী বর্ষণের কারণে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির ফলে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ডলু, টঙ্কাবতীসহ বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। সেই পানি নিম্নাঞ্চলে নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। এর সঙ্গে পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় নদীর পানি দ্রুত সাগরে নামতে পারেনি। ফলে নদী-খাল উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।

কেন দীর্ঘ সময় পানি নামছে না?

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কয়েকটি কারণ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে— টানা বৃষ্টির কারণে নদী ও খাল পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত, পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় নতুন করে পানি যোগ হচ্ছে, জোয়ারের সময় নদীর পানি উল্টো চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়াঅনেক খাল ও জলাধার ভরাট এবং অপরিকল্পিত বসতি ও সড়ক নির্মাণের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা

দক্ষিণ চট্টগ্রামে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে—সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশের কিছু এলাকা, আনোয়ারার নিম্নাঞ্চল, ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়া।
কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার মধ্যে চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী উপজেলা, বরইতলী, কাকারা, হারবাং,
ডুলাহাজারা, রাজাখালী, টৈটং ও শিলখালীসহ বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল।

মানবিক বিপর্যয়

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে  বন্যার কারণে বহু মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না, শুকনো খাবার ও শিশুখাদ্যের অভাব তৈরি হয়েছে। কৃষিজমি, আমনের বীজতলা, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতেও লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আহ্বান জানিয়েছে। শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য চাল, শুকনো খাবার ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সামনে কী আশঙ্কা?

আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এমন আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নদী ও খাল পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, দখলমুক্ত জলাধার এবং টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

ফরিদা|তাসু|চখ

এই বিভাগের আরও খবর