chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

মিরসরাইয়ে বন্যার সময় মাঠে নেই সিপিপি

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকেও পাহাড়ধসের আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসাসহ দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা কার্যক্রমে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় থাকার কথা। কিন্তু চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে মিরসরাইয়ে তাদের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা।

সরেজমিনে উপজেলা সিপিপি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিসটি তালাবদ্ধ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পর অফিস সহায়ক এসে তালা খুলে দেন। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, সমন্বয়কের কক্ষে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। অযত্নে পড়ে আছে টেবিল-চেয়ার, ফাইল ক্যাবিনেটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। রেডিও, মেগাফোন, লাইফ জ্যাকেটসহ দুর্যোগ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ এমন দুর্যোগকালে উপজেলা সিপিপি কার্যালয়ে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকার কথা ছিল।

কার্যালয়টি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। দুটি কক্ষের একটিতে ওয়্যারলেস (বেতার) রুম এবং অন্যটি উপজেলা সমন্বয়কের কার্যালয়। ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় বিভিন্ন আসবাবপত্রও নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

অফিসে গিয়ে কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। দায়িত্বে থাকা অফিস সহায়ক (পিয়ন) সুমন জানান, বর্তমানে নিয়মিত কোনো কর্মকর্তা অফিসে আসেন না। তার দায়িত্ব মূলত ওয়্যারলেস কক্ষ খোলা ও বন্ধ করা। তিনি আরও জানান, ওয়্যারলেস অপারেটর জসিম অসুস্থ থাকায় কয়েকদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলা সিপিপির উপজেলা সহকারী পরিচালক (এডি) পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলার কার্যক্রম তদারকি করছেন।

এ বিষয়ে জেলা সিপিপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “মিরসরাই আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব। জেলার পাশাপাশি আরও কয়েকটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হয়। আমি নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। সর্বশেষ গত ২৯ জুন মিরসরাইয়ে একটি সভায় অংশ নিয়েছি। জনবল সংকট রয়েছে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও কিছু ঘাটতি আছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেন।”

তিনি আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় কয়েক হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও সেখানে আগে থেকে কোনো সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিল না। তবে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে সিপিপির ৮০টি দল রয়েছে। প্রতিটি দলে ২০ জন করে মোট ১ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউনিয়ন টিম লিডারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সভা, প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। উপজেলা অফিসে কর্মকর্তাদের না পেয়ে অনেক স্বেচ্ছাসেবক সম্পৃক্ত থাকতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলা সিপিপি কার্যালয়ে সর্বশেষ উপজেলা পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর। এরপর নিয়মিত সভা, প্রশিক্ষণ বা সাংগঠনিক কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি।

৭ বছর আগে ২৫ জুন ২০১৯ সালের মিটিংয়ের রেজ্যুলেশন মতো উপজেলা সমন্বয়ক ও ১১ ইউনিয়নের টিম লীডার হচ্ছেন, উপজেলা সমন্বয়ক মোঃ সাইফুল্লাহ দিদার। মোঃ আবুল কাশেম, মোঃ আব্দুল কালাম আজাদ, মোঃ নুরুল্লা , মোঃ হাসান শাহরিয়ার চৌধুরী,  মোঃ নুরুল মোস্তফা , নুরুল আবছার , মোঃ নুর হোসেন, মোঃ শামসুল আলম বাচ্চু , মোঃ আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, মোঃ মাহবুবুল হক নিজামী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ  বেঁচে নেই। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন অন্যজন।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দার দাবি, টানা ছয় দিনের ভয়াবহ বর্ষণ ও বন্যার সময় তারা সিপিপির কোনো সমন্বিত তৎপরতা বা স্বেচ্ছাসেবকদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখেননি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইসমাঈল বলেন, “সিপিপি একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান। তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।”

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি কর্মসূচি। এর প্রধান দায়িত্ব হলো দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, উদ্ধারকাজে সহায়তা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদান। উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কার্যক্রম পরিচালনার কথা।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সোমাইয়া আক্তার বলেন, “সর্বশেষ ২৯ জুন সিপিপির সঙ্গে আমার সভা হয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার সময় মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলমান বন্যায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। এরপরও সিপিপির পক্ষ থেকে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমিও মাঠে তাদের কোনো কার্যক্রম দেখিনি। তবে মিরসরাইয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ায় সেটিও একটি কারণ হতে পারে।”

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর