পানি সংকট, জলাবদ্ধতা ও কিশোর গ্যাং দমনে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি
উত্তর কাট্টলীতে ভোটের আগাম হাওয়া
চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম ওয়ার্ডগুলোর একটি উত্তর কাট্টলী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা এ ওয়ার্ডের বুক চিরে প্রতিদিন চলাচল করে হাজারো যানবাহন, আসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা। ফলে নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবকিছু মিলিয়ে ওয়ার্ডটির গুরুত্ব অন্য অনেক এলাকার চেয়ে বেশি।
এ ওয়ার্ডেই রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, যেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক কৈবল্যধাম মন্দির এবং শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উত্তর কাট্টলীকে চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে।
কিন্তু এত গুরুত্বের পরও উত্তর কাট্টলীর মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি যেন শেষ হচ্ছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, মশার উপদ্রব, যানজট, পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক-দুই বছরের নয়—দশকের পর দশক ধরে এসব সমস্যা বহন করে চলেছে ওয়ার্ডবাসী।
এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর কাট্টলীতে নির্বাচনের আগাম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা এখন থেকেই জনসংযোগ বাড়াচ্ছেন, দিচ্ছেন নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। আর ভোটের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে বিশুদ্ধ পানি, জলাবদ্ধতা, মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো।
ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মো. রফিক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তাঁর রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার উৎস একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবা। সেই আদর্শ থেকেই মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে তাঁর। তিনি মনে করেন, উত্তর কাট্টলীর সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানির অভাব।
রফিক উদ্দিন জানান, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ওয়াসার পানির বিকল্প পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের ওয়ার্ডে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করেন। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এখন আমরা আবার সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।”
নির্বাচিত হলে পানি সংকট নিরসন, বেকারত্ব দূরীকরণ, জলাবদ্ধতা কমানো, সড়ক সংস্কার এবং কিশোর গ্যাং ও মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি সাহেদ আকবর উত্তর কাট্টলীকে আধুনিক ও শিক্ষাবান্ধব ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমি একটি অসাম্প্রদায়িক, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত কাট্টলী চাই। আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর সমাজ রেখে যেতে চাই।”
সাহেদ আকবর দাবি করেন, গত দেড় বছরে বিভিন্ন এলাকায় ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, সড়ক সংস্কার ও ড্রেন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ওয়াসার পানির সংকট বর্তমানে এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা। নির্বাচিত হলে বিশুদ্ধ পানির কষ্ট দূর করাই হবে তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সাধারন সম্পাদক ১০ নং উত্তর কাট্টলি ওয়ার্ড বি এন পি সদস্য ও শ্রমিক নেতা সামসুল আলমও। তিনি বলেন, পানি সংকট, জলাবদ্ধতা ও কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি নারীর শিক্ষা বিস্তার ও বেকারত্ব দূরীকরণেও কাজ করতে চান তিনি।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আল আমিন হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাহাদাত হোসেনের নামও এলাকায় আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে হজ পালনে দেশের বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তর কাট্টলীতে প্রায় ৪১ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এ ওয়ার্ডে সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ দীর্ঘদিনের। তবে নাগরিক সেবার ঘাটতি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে দিন দিন বাড়ছে জনদুর্ভোগ।
নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই এখন উত্তর কাট্টলীর অলিগলি, চায়ের দোকান কিংবা সামাজিক আড্ডা—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে এবার এমন একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, যিনি সত্যিকার অর্থেই উত্তর কাট্টলীর দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
