chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

অটোমেশনে পোশাক খাতে ৬০% শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার শঙ্কা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে দ্রুত বাড়ছে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে কারখানাগুলো যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে লাখ লাখ শ্রমিককে। বিভিন্ন গবেষণা ও সংস্থার তথ্য বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের পোশাক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন , ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে তৈরি পোশাক খাতের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ইতোমধ্যে কমে গেছে। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৪২৯ জন শ্রমিকের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিম্নপদে কর্মরত ‘হেল্পার’রা।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সোয়েটার কারখানার প্রতিটি উৎপাদন লাইনে শ্রমিক সংখ্যা ৩৭ শতাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে ওভেন গার্মেন্টসে শ্রমিক কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ।

এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্স বলছে, দেশের প্রতি ১০ জন পোশাক কারখানা মালিকের মধ্যে ৮ জনই আগামী দুই বছরের মধ্যে অটোমেশনে নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে একটি গড় কারখানায় যেখানে প্রায় ২ হাজার ২৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালুর পর সরাসরি প্রয়োজন হবে মাত্র ৫০০ জনের। ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।

সরকারের এটুআই প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ বা প্রায় ৫৩ লাখ ৮০ হাজার পোশাকশ্রমিক অটোমেশনের কারণে কাজ হারাতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হবেন নারী শ্রমিকরা। কারণ তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের বড় একটি অংশ কম শিক্ষিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে এখনও বঞ্চিত। ফলে নতুন প্রযুক্তি চালু হলে তারাই সবার আগে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন।

অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও বিলুপ্ত হবে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এসব চাকরি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তাসহ উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক খাতে তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের নিম্নআয়ের পোশাকশ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য নয়।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনঃপ্রশিক্ষণ (রিস্কিলিং) কর্মসূচি পরিচালনা করলেও বাস্তবতায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২২-২০২৭ সালের জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ৬১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ায় সমন্বয় সংকটও তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন শিল্প খাত সৃষ্টি, কর্মসংস্থানের বহুমুখীকরণ এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। অন্যথায় অটোমেশনের সুফল শিল্প পেলেও এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন লাখ লাখ পোশাকশ্রমিক এবং তাদের পরিবার।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর