ভোটের হাওয়া ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে
১৬ বছর পর ‘মহামূল্যবান’ ব্যালটে যোগ্য অভিভাবক খুঁজছেন শ্রমজীবী মানুষ
ভোরের আলো ফোটার আগেই নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে চাটগাঁর বুক। অলিগলি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ বেরিয়ে আসেন রাজপথে। তাদের কেউ পোশাক কারখানার কর্মী, কেউ দিনমজুর, কেউ বা ছোট ব্যবসায়ী। এই খেটে খাওয়া, কর্মব্যস্ত মানুষদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড এলাকাটি। প্রায় ২ দশমিক ৪১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ার্ডটির বেশিরভাগ বাসিন্দাই জীবিকার তাগিদে আসা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অস্থায়ী মানুষ।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে এই এলাকায় লেগেছে এক ভিন্ন হাওয়া। অতীতের ‘ভোটহীন’ কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের খরা কাটিয়ে এবার লড়াইটা ভিন্ন। প্রার্থীরা ভালো করেই জানেন, এবার আর শুধু টেবিল বা পেশিশক্তিতে পার পাওয়া যাবে না। জনপ্রতিনিধি হতে হলে প্রয়োজন এই সাধারণ, অসহায় ও খেটে খাওয়া মানুষের একেকটি ‘মহামূল্যবান’ ভোট। আর তাই, ভোটারদের মন গলাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পাড়া-মহল্লায় দৌড়ঝাঁপ। প্রার্থীদের রঙ-বেরঙের প্রতিশ্রুতি আর আশার বাণীতে ভোটারদের মনে যেমন আশার আলো জাগছে, তেমনই তৈরি হয়েছে এক মধুর দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাকে বেছে নেবেন তারা তাদের পরম যোগ্য অভিভাবক হিসেবে।
এলাকার দীর্ঘদিনের চেনা মুখ, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক মুহাম্মদ হাসান লিটন এবার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। অতীতের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ২০১০, ২০১৫ এবং ২০২১ সালের চরম প্রতিকূল ও দুঃসময়েও আমি দলের পক্ষে এই ওয়ার্ড থেকে লড়াই করেছি। সে সময় যে সামান্য কিছু মানুষ বুক পেতে ভোটকেন্দ্রে যেতে পেরেছিলেন, তারা তাদের উজাড় করা ভালোবাসা আমাকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জনগণের আর ভোটই লাগেনি, ভোট ছাড়াই আসন দখল করা হয়েছিল। ফলাফল বিকৃত হলেও জনগণের সেই ভালোবাসার ঋণ আমি ভুলিনি। এবার সময় এসেছে সেই ঋণের প্রতিদান দেওয়ার। দেশে আজ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সুবাতাস বইছে। আমি নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে এই গণবসতিপূর্ণ ওয়ার্ডের অবহেলিত মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আমাদের এলাকায় এখনও অনেক রাস্তা কাঁচা ও আধা-কাঁচা রয়ে গেছে। আমি সিটি কর্পোরেশনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে প্রতিটি রাস্তা দ্রুততম সময়ে পাকা করব। আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখানে একটি আধুনিক ‘দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র’ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো গরিব মানুষকে টাকার অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরতে হবে না। করোনাকালে ঝরে পড়া এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে ফেরাতে সিটি কর্পোরেশনের বিশেষ শিক্ষাকর্মসূচিকে আমি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেব। এছাড়া বিগত দিনে তৈরি হওয়া মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের যে নারকীয় সিন্ডিকেট আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে তার মূলোৎপাটন করব। জলাবদ্ধতা নিরসনে নিচু সড়কগুলো উঁচু করব এবং সর্বস্তরের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্থায়ী ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়’ স্থাপন করব। একটি নাগরিকও যেন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, এটাই আমার একমাত্র অঙ্গীকার।
নির্বাচনী মাঠ গরম করে রেখেছেন মহানগর বিএনপির সহ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক ও ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ। সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, অতীতের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী শুধু আমাদের ওয়ার্ডেই নয়, পুরো বাংলাদেশে মাদকের এক মরণফাঁদ এবং কিশোর গ্যাংয়ের নোংরা সংস্কৃতি তৈরি করে গেছে। এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে হলে সবার আগে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আমি নির্বাচিত হওয়ার সাথে সাথেই প্রতিটি পাড়া-মহল্লার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, মসজিদের ইমাম ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ কমিটি’ গড়ে তুলব। প্রশাসনকে সাথে নিয়ে আমরা এমন সমাজ গড়ব যেখানে কোনো কিশোর অপরাধী থাকবে না।
আমাদের শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সুস্থ বিনোদনের জন্য কোনো খেলার মাঠ নেই। আমি ইতিমধ্যেই ওয়ার্ডের কয়েকটি পরিত্যক্ত ও উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করেছি, যেখানে আমরা দৃষ্টিনন্দন খেলার মাঠ গড়ে তুলব। বর্তমানে মাননীয় মেয়রের আন্তরিক প্রচেষ্টায় খাল খনন ও নর্দমা পরিষ্কারের ফলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে এসেছে। চলমান এই উন্নয়ন কাজকে আমি আরও গতিশীল করব এবং ওয়ার্ডের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় শান্তিময় ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করব।
একই সুর শোনা গেল বাকলিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ও রাহাত্তার পুল মহল্লা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ মামুনুর রহমানের কণ্ঠে। যুবসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমাদের পূর্ব ষোলশহরের মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাথে আমি বহু বছর ধরে জড়িয়ে আছি। এখানকার প্রধান অভিশাপ হলো জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানির দুর্ভোগ। একটু বৃষ্টি হলেই কিংবা কর্ণফুলীর জোয়ার এলেই মানুষের ঘরে পানি ঢুকে যায়। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট আর বেহাল পায়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমি অতীতেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু সমাজকে আমূল বদলে দিতে একটি দায়িত্বশীল পদের প্রয়োজন। তাই আমার এই নির্বাচনী লড়াই।
আমি ওয়াদা করছি, নির্বাচিত হলে এই এলাকার ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে জলাবদ্ধতার চিরতরে অবসান ঘটাব। মেহনতি মানুষের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব। সবচেয়ে বড় কথা, অবহেলিত ও প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে বণ্টন করব। আমি অনেকের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শুনেছি, অসহায় মায়েদের মাতৃত্বকালীন ও বিধবা ভাতা পেতেও নাকি অতীতে ঘুষ দিতে হতো! আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আমার ওয়ার্ডে এই সরকারি সেবা পেতে এক পয়সাও কাউকে দিতে হবে না। ভালোবাসা আর সততা দিয়ে আমি এই ওয়ার্ডটিকে এমনভাবে সাজাব, যেন আগামী দিনে কেউ কোনোদিন আঙুল তোলার সুযোগ না পায়।
বাইরে নির্বাচনী আমেজ থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভোটারদের মনে জমে আছে একরাশ ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস। চান্দগাঁও থানার আওতাধীন এবং চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডটিতে নাগরিক ভোগান্তি চরমে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৌদিয়া গ্যারেজের সামনে একটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারগামী হাজার হাজার দূরপাল্লার যানবাহনকে প্রতিদিন তীব্র যানজট ও ধুলোবালির দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং সঠিক ডাস্টবিন না থাকায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা তসলিম আলি নেওয়াজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। একটি চারিত্রিক সনদ বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজের জন্য মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজার টাকা ঘুষ না দিলে কাজই হয় না। আমরা এমন একজন অভিভাবক চাই, যিনি জনগণের সেবক হবেন, শোষক নন।
ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে অপর বাসিন্দা রফিক তালুকদার বলেন, আমরা চাই না আমাদের নিষ্পাপ সন্তানদের রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহার করা হোক। সামান্য কথা কাটাকাটিতে কিশোরেরা দলবল নিয়ে মারামারি করে এই গ্যাং কালচার বন্ধ করতে হবে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অপসংস্কৃতি যেন নতুন করে জেঁকে না বসে, সেদিকে হবু কাউন্সিলরকে কঠোর নজর রাখতে হবে।
ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, হিসাব-নিকাশ ততই জটিল হচ্ছে। তবে এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবার আর কোনো ভুল করতে চান না। তারা চান এমন একজন সৎ, যোগ্য ও সাহসী অভিভাবক যিনি শুধু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফোটাবেন না, বরং মাদক, কিশোর গ্যাং ও জলাবদ্ধতা মুক্ত এক আধুনিক ‘স্মার্ট ওয়ার্ড’ উপহার দিয়ে পূর্ব ষোলশহরের মেহনতি মানুষের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটাবেন।
