জলাবদ্ধতা, মাদক, ভাঙা সড়কের দুর্ভোগ পেরিয়ে বদলের অপেক্ষায় এক বাণিজ্যিক ওয়ার্ড
অন্তহীন সমস্যা পুঁজি করে নির্বাচনে নামবেন প্রার্থীরা
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকার পাঠানটুলি ওয়ার্ডে শুরু হয় ব্যস্ততা। কেউ লোকাল বাসে, কেউ সিএনজি অটোরিকশায়, আবার কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে ছুটে আসেন কর্মস্থলে। স্যুট-কোট, টাই আর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে একে একে ঢুকে পড়েন আগ্রাবাদের ব্যাংকপাড়ার বিভিন্ন ব্যাংক শাখায়। কেউ দোকানের শাটার তোলেন, কেউ অফিস খুলে দিনের কাজ শুরু করেন। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ড।
নগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই ওয়ার্ডে রয়েছে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, ব্যাংকপাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় ব্যস্ত থাকা এই এলাকাটি নানা সম্ভাবনার কেন্দ্র হলেও দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, মাদক, কিশোর গ্যাং, ভাঙাচোরা সড়ক, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যায় জর্জরিত বাসিন্দারা।
আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে এবার সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসী। কেউ মাদকমুক্ত ওয়ার্ড গড়ার অঙ্গীকার করছেন, কেউ জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, আবার কেউ তরুণদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলছেন। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—নির্বাচনের পর এসব প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হবে?
১ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পাঠানটুলি ওয়ার্ডে ৫০ হাজার ৪১০ জন মানুষের বসবাস। বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে। ওয়ার্ডটিতে রয়েছে বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ, পাঠানটুলি খান সাহেব আব্দুল আজিজ সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে এটি নগরের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এস এম জামাল উদ্দিন জসিম বলেন, তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ১৯৮৭ সালে। ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতি শেষে ২০০৮ সালে তিনি ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতি হন। ২০২০ সালের চসিক নির্বাচনে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবেও অংশ নেন। তিনি বলেন, “জলাবদ্ধতা, মাদক ও পরিচ্ছন্নতা—এই তিনটি সমস্যা সবচেয়ে বড়। জনগণ ভোট দিলে দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। পাঠানটুলিকে একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বাণিজ্যিক ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান মনে করেন, পাঠানটুলির উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তি। তার মতে, তরুণ সমাজের একটি অংশ ভয়াবহ নেশায় জড়িয়ে পরিবার ও সমাজের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙা রাস্তা, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাবে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের দাতব্য ক্লিনিকের কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করার কথাও জানান তিনি।
ডবলমুরিং থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুর উদ্দিন সোহেল বলেন, অতীতে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ বিভিন্ন ভাতা সঠিকভাবে বিতরণ হয়নি। নির্বাচিত হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে ভাতা পৌঁছে দিতে চান তিনি। পাশাপাশি এটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেও তিনি জরুরি মনে করেন। সিটি মেয়রের ‘গ্রীন সিটি’ ও ‘হেলদি সিটি’ উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পাঠানটুলিকে “সেইফ সিটি” হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
ডাবলমুরিং থানা যুবদল চট্টগ্রাম মহানগর সাংগঠক ও আরাফাত রহমান কোক স্মৃতি সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর সহ-সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বাপ্পী বলেন, দীর্ঘদিন রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের পাশে রয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, আগ্রাবাদ ব্যাংকপাড়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক মার্কেট থাকলেও ওয়ার্ডের অনেক অলিগলির সড়ক এখনো ভাঙাচোরা। জলাবদ্ধতা, মাদক ও কিশোর গ্যাং বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচিত হলে রাস্তাঘাট উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূলে কাজ করতে চান তিনি। তার লক্ষ্য, পাঠানটুলিকে একটি “মডেল ওয়ার্ড” হিসেবে গড়ে তোলা।
২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি ও ডবলমুরিং থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দুলাল দোভাষ বলেন, গত ৩০ বছর ধরে তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করে আসছেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষ্য, এই ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা, মাদক ও চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও আগের কাউন্সিলররা সেগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেননি। নির্বাচিত হলে তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মাদকমুক্ত ও জলাবদ্ধতামুক্ত ওয়ার্ড গড়ে তুলতে চান।
বাংলাবাজার সমাজ উন্নয়ন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াসিন রেজা রাজু বলেন, যুব সমাজকে কর্মমুখী করাই তার প্রধান লক্ষ্য। তার মতে, বেকারত্বের কারণেই অনেক তরুণ মাদক ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে মাদক, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সম্ভব হবে। তিনি একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত ওয়ার্ড গড়ার অঙ্গীকার করেন।
তবে স্থানীয়দের মতে, নির্বাচনের আগে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু নাগরিক দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এলাকার বাসিন্দা মো. আবদুল হক বলেন, অনেক অলিগলির রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন, গ্যাস ও পানির সমস্যার সমাধানেও গুরুত্ব দিতে হবে। তার প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের জনপ্রতিনিধিরা যেন শুধু নিজেদের নয়, সাধারণ মানুষের কথাও ভাবেন।
আরেক বাসিন্দা তাজোয়ার হোসেনের ভাষায়, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের কাছে থাকলেও নির্বাচিত হওয়ার পর অনেকের আর দেখা মেলে না। তিনি বলেন, “আমি এমন একজন কাউন্সিলর চাই, যিনি শুধু অফিসে বসে থাকবেন না বরং সাধারণ মানুষের সেবার জন্য অপেক্ষা করবেন।”
এখানকার একটি ব্যাংকে কর্মরত জুলফিকার মাহমুদ বলেন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কোনো সাধারণ এলাকা নয় এটি চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র। তাই এই এলাকাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এখানে কাজ করতে আসা মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়। তার মতে, ভোটাররা এমন একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করুন, যিনি সবার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন।
জুতা ব্যবসায়ী নজু মিয়ার প্রত্যাশাও একই ধরনের। তিনি বলেন, “আমরা যেন নিরাপদে ব্যবসা করতে পারি, চাঁদাবাজির শিকার না হই—সেদিকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নজর দিতে হবে।”
বাণিজ্যিক গুরুত্ব, জনঘনত্ব ও প্রতিদিনের কর্মচাঞ্চল্যে পাঠানটুলি নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও নাগরিক দুর্ভোগ যেন এখানকার নিত্যসঙ্গী। এবার নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে আশার কথা শোনা যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুতির রাজনীতি পেরিয়ে বাস্তব উন্নয়নের ছোঁয়া কতটা পায় পাঠানটুলিবাসী।
