chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

প্রত্যাশার পারদ ৩৮ নং ওয়ার্ডে

বদলের খোঁজে জনতা

দুপুরে তপ্ত রোদ কিংবা বর্ষার এক পশলা বৃষ্টি চট্টগ্রামের বন্দর আর সিইপিজেড সংলগ্ন সড়কগুলোতে ট্রেইলর আর কাভার্ড ভ্যানের চাকার নিচে যেন অবিরাম ঘুরতে থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা। ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডটি আসলে এক টুকরো মিনি বাংলাদেশ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো শ্রমজীবী মানুষের ঘাম আর শ্রমে সচল এই জনপদ। কিন্তু এই সচলতার আড়ালেই জমে আছে একরাশ নাগরিক ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘদিন কোনো জনপ্রতিনিধি বা কাউন্সিলর না থাকায় থমকে আছে সাধারণ সেবা, বেড়েছে জনদুর্ভোগ।

তবে বন্দরনগরীর এই ‘অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডে’ এখন বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলের অলিগলিতে এখন একটাই আলোচনা কে হচ্ছেন আগামী দিনের অভিভাবক? সম্ভাব্য প্রার্থীরাও দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কেউ বলছেন কিশোর গ্যাং রুখবেন, কেউ মেগা প্রজেক্টে জলাবদ্ধতা তাড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, আবার কারও প্রতিশ্রুতি এলাকায় গড়বেন প্রথম কোনো উচ্চমানের কলেজ।

সাড়ে সাত বর্গকিলোমিটারের এই ওয়ার্ডটিতে স্থায়ী বাসিন্দার চেয়ে ভাসমান মানুষের সংখ্যাই বেশি। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য সচল থাকলেও ধূপপুল বা সল্টগোলার নিচু এলাকার বাসিন্দাদের জীবন জোয়ারের পানিতে ভাসে। তবে এবারের নির্বাচনে বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া—কাউন্সিলর অফিসের দুর্নীতি ও হয়রানি থেকে মুক্তি।

ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনতাজ উদ্দিনের কণ্ঠে সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটল। তিনি বলেন, “এখন কাউন্সিলর নাই, জরুরি অনেক কাজ থমকে আছে। আগের দিনগুলোতে কাউন্সিলর অফিসে গেলে টাকা ছাড়া কথাই বলা যেত না। আমরা এমন লোক চাই, যে আমাদের সহজে সরকারি সেবা দেবে, কোনো ঘুষ-হয়রানি করবে না।”
একই সুর ফুটল বয়োবৃদ্ধ আছিয়া বেগমের কণ্ঠেও। ক্ষোভ আর আকুতি মেশানো গলায় তিনি বলেন, “গরিব মানুষ, হাত পেতে খেতে পারি না। সরকার নাকি ভাতা দেয়, কিন্তু অতীতে ভাতার ফর্ম তুলতেই পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হতো। সরকারি সাহায্য এলেও দেওয়া হতো মুখ দেখে দেখে। এই বৈষম্য আমরা আর চাই না।”
এদিকে, নির্বাচনের হাওয়া চাঙ্গা হতেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। অতীতের দুঃখ ভুলে ভোটারদের মন জয়ে ব্যস্ত রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন ফোরামের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

ওয়ার্ড বিএনপি ও বন্দর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ্ব মো. হানিফ নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। বিগত সরকারের আমলের জুলুম-মামলার শিকার এই নেতা বলেন, “দলের দুঃসময়ে পাশে ছিলাম, শান্তিতে একটা রাতও নিজের ঘরে ঘুমাতে পারিনি। ২০১০, ২০১৫ ও ২০২০ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনেও আমার এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসার ভোট দিয়েছিল।”

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকার উন্নয়নে সবার আগে মাঠে নেমেছেন দাবি করে তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় মানুষের জন্য কাজ করার তেম সুযোগ পাইনি। সেই দুঃখ মনে জমে ছিল। এবার সুযোগ পেয়েই বর্তমান মেয়রের সঙ্গে কথা বলে এলাকার প্রাণ মহেষ খাল খননের কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে ২২টি ভাঙাচোরা রাস্তার কাজ ধরেছি। তারবেশিভাগ অর্থ নিজের থেকে দিয়েই। নির্বাচিত হলে কিশোর গ্যাং ও মাদক বাণিজ্য পুরোপুরি ধ্বংস করব। অবহেলিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে নারী শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেব।”

৩৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আজম উদ্দিনের নজর এলাকার শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দিকে। ওয়ার্ডে কোনো কলেজ না থাকার শূন্যতা দূর করতে চান তিনি। আজম উদ্দিন বলেন, “এত বড় একটা শিল্পাঞ্চল, অথচ এখানে কোনো ভালো কলেজ নেই। আমি একটি উচ্চমানের কলেজ করতে চাই। আর কাউন্সিলর অফিস নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ, তা দূর করব। জন্ম নিবন্ধন বা ওয়ারিশ সনদের মতো সরকারি ফ্রি সেবাগুলোতে কোনো অনৈতিক টাকা নেওয়া হবে না। যার যা প্রাপ্য—তা সে বিধবা ভাতা হোক বা প্রতিবন্ধী ভাতা, সরাসরি গরিবের হাতে পৌঁছাবে।” আমার নিজের এলাকা ও এলাকাবাসিকে ভালোবেসেই কাজ করবো।

৩৮ নং ওয়ার্ড উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি ও জামায়াত সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন জোর দিচ্ছেন এলাকার বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের ওপর। তিনি বলেন, “এই ওয়ার্ডটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, এখানে লাখ লাখ নারী পোশাক শ্রমিক বাস করেন। পাশাপাশি রয়েছে পুরুষ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব।” যুবসমাজকে অপরাধের পথ থেকে ফেরাতে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, স্বল্প শিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করব যাতে এই শিল্পাঞ্চলেই তাদের চাকরি হয়। কর্মসংস্থান হলে মাদক আর কিশোর অপরাধ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার রেখে জলাবদ্ধতা দূর করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।” শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিবো।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক স্থানীয় বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব মো. কামালও মনে করেন, এই ওয়ার্ডের প্রধান ক্ষত দুটি—জলাবদ্ধতা ও বেকারত্ব। তিনি বলেন, “জোয়ারের পানিতে নিচু এলাকার মানুষের যে কষ্ট, তা আমি দূর করতে চাই। প্রশাসনের সহায়তায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের রমরমা ব্যবসা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য একটি কলেজ নির্মাণ করব, যাতে ঘরের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য দূরে যেতে না হয়।”
৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা এবার বেশ সচেতন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝতে পেরেছেন, শুধু চটকদার কথায় এলাকার ভাগ্য বদলায় না। জোয়ারের পানি থেকে মুক্তি, মাদকমুক্ত সমাজ আর কাউন্সিলর অফিসের টেবিলের তলা দিয়ে টাকা দেওয়ার সংস্কৃতি যিনি বন্ধ করতে পারবেন—তাঁকেই এবার ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের ঘরের অভিভাবক হিসেবে বেছে নেবেন এই ‘অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড’র বাসিন্দারা।

এই বিভাগের আরও খবর