বাজেট মানেই দাম বাড়া-কমার খেলা, আমরা গরিবরা এত হিসাব বুঝে লাভ কী!
দেশজুড়ে চলছে নতুন অর্থবছর (২০২৬-২০২৭) এর বাজেট পেশের প্রস্তুতি। প্রায় ৯ লাখ ৩৫ কোটি টাকারও বেশি বিশাল অঙ্কের এই বাজেট নিয়ে সচিবালয়ে যখন নথিপত্র গোছানো হচ্ছে, তখন বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মনে কেবলই একটাই দুশ্চিন্তা “এবার কোন জিনিসের দাম বাড়বে আর কোনটা কমবে?” নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর যেন আর না বাড়ে, এটাই এখন বন্দরনগরীর খেটে খাওয়া মানুষের একমাত্র চাওয়া।
বাজেটের জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই ইপিজেডের পোশাক কর্মী মো. ফোরকানের। চট্টগ্রামের ফ্রিপোর্ট এলাকার একটি পোশাক কারখানায় দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন তিনি। মাস শেষে যা পান, তা দিয়ে দক্ষিণ হালিশহরে পাঁচ সদস্যের পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়।
বাজেট প্রসঙ্গে ফোরকান বলেন, “ডিউটি শেষে রাতে যখন বাসায় ফিরি, তখন মোবাইলে কিংবা চায়ের দোকানে শুনি বাজেটের কথা। আমরা শুধু এতটুকুই বুঝি কোন জিনিসটার দাম বাড়ল আর কোনটা কমল। আমাদের মতো গরিবের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে থাকলেই আমাদের বাজেট সফল।”
আইএমএফ’এর শর্ত মেনে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে সাধারণ মানুষের পাতিল ও থালায়। চট্টগ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী।
বহদ্দারহাট মোড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে দৈনিক ৬৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করা চকোরিয়ার আকরাম হোসেনের কণ্ঠে ঝরল হতাশা। তিনি বলেন, “বাজেট আসলেই নাকি দেশ বড় হয়, কিন্তু আমাদের মতো দিনমজুরদের তো মজুরি বাড়ে না। চাল-ডাল আর তেলের দাম যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। সরকারের কাছে কোনো বড় দাবি নেই, শুধু চাল-ডাল-নুন যেন সস্তা থাকে। দুইটা ভাত শান্তিতে খেতে পারলেই বাঁচি।”
শুধু নিম্নবিত্ত নয়, বাজেটের করের বোঝা আর মূল্যস্ফীতির চাপে কোণঠাসা চট্টগ্রামের মধ্যবিত্ত সমাজও। আগ্রাবাদের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাইহানুল ইসলাম নিজেকে ‘সংকুচিত মধ্যবিত্ত’ দাবি করে বলেন, “বিগত কয়েক বছরে আয় বাড়েনি, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ ডাবল হয়েছে। সন্তানদের প্রাইভেট টিউটর বাদ দিয়ে কোচিংয়ে দিতে হয়েছে। খরচ বাঁচাতে পদে পদে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।” তার দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৫ লাখ টাকা করা উচিত।
অন্যদিকে, ব্যবসার টিকে থাকার লড়াই নিয়ে চিন্তিত নাসিরাবাদের বুটিক ব্যবসায়ী নারী উদ্যোক্তা সায়মা সুলতানা। তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য যদি বাজেটে বিশেষ ট্যাক্স হলিডে বা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না রাখা হয়, তবে বুটিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
প্রযুক্তি খাতের কর ও শুল্ক কমানোর দাবি তুলেছেন চট্টগ্রামের তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ফাহিম মুনতাসির জানান, “ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হলেও ল্যাপটপ, কম্পিউটার পার্টস এবং ইন্টারনেটের ওপর যদি ভ্যাট-ট্যাক্স না কমানো হয়, তবে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং বা আইটি খাতে ক্যারিয়ার গড়া কঠিন হয়ে পড়বে।”
সব মিলিয়ে, পাহাড়-সমুদ্র ঘেরা এই বাণিজ্যিক রাজধানীর সাধারণ মানুষ এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তাদের জন্য স্বস্তির বার্তা আনে, নাকি মূল্যস্ফীতির বোঝা আরও ভারী করে।
