chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামে বন্যায় দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৬ হাজার ৮২১ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের একটি অংশ ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এতে শুধু ঘরবাড়ি নয়, জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।

সম্প্রতি জেনেভাভিত্তিক ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) এবং ঢাকাভিত্তিক রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এসব বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

গবেষকদের ভাষ্য, বর্তমানে যাঁরা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, তাঁদের সবাই নিজ বাড়িতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। বিশেষ করে পাহাড়ধস ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার স্থায়ীভাবে বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। এতে দরিদ্র পরিবার আরও দরিদ্র হয়ে পড়বে এবং দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা প্রায় ২০ শতাংশ পরিবার জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে।

চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি আশ্রয়কেন্দ্র
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। তাদের জন্য খোলা হয়েছে ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রামেই রয়েছে সর্বোচ্চ ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র।

অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী বিশেষজ্ঞরা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করা হয়েছে। এর ফলেই পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে।
তার মতে, প্রকৃতিবিরোধী উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে এবং এই প্রবণতা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে।

বাস্তুচ্যুতির অদৃশ্য ক্ষতি
গবেষণায় শুধু ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতি নয়, বাস্তুচ্যুত মানুষের মানসিক ট্রমা, সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিঘ্ন, কর্মসংস্থান হারানো এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
রামরুর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মাহমুদুল হাসান রকি বলেন, দুর্যোগের পর অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে এলেও নতুন পরিবেশে তারা টিকে থাকতে পারেন না। পুরোনো পেশা হারিয়ে অনেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।

সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী দিনে বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষতি আরও বাড়বে। বর্তমানে এসব কারণে বছরে প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হলেও শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা ১৭৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ নয়, দুর্যোগসহনশীল আবাসন, পাহাড় ও বন সংরক্ষণ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য ও মানবিক সংকটের এই চক্র আরও তীব্র হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও খবর