চট্টগ্রামে পাহাড়ের বুকে জীবনবাজি : ঝুঁকিতে হাজারো প্রাণ
টানা বর্ষণ, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরের মতো এবারও ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম। উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় সৃষ্ট মৌসুমি স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত হাজারো পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোমবার (৬ জুলাই) সকাল থেকেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন নগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, উদ্ধারকারী দল মোতায়েন এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
যেসব এলাকায় চলছে সতর্কতা
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় রয়েছে—আকবরশাহ ঝিল (১, ২ ও ৩ নম্বর), বিজয়নগর পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলীঘোনা পাহাড়,
টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা,সমবায় আবাসিক এলাকা, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের পাহাড়, মতিঝর্ণা, লালখান বাজার পোড়া কলোনি
ঢেবারপাড়, আমবাগান,উত্তর হালিশহর উপকূলসংলগ্ন এলাকা
এসব এলাকায় মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারির পর পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। মাইকিংয়ের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়সংলগ্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। কেউ যাতে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে অবস্থান না করেন, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর নজরদারি করছে।
চসিকের বিশেষ উদ্যোগ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নিজস্ব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সেল চালু রেখেছে। প্রতিটি আঞ্চলিক কার্যালয়কে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ব্যবস্থা,পাহাড়ি এলাকায় সতর্কীকরণ কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, কাউন্সিলরদের মাধ্যমে স্থানীয়দের সতর্ক করা।
নগরে কোথায় কত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়
জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পরিবেশ অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নগরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে—আকবরশাহ,
ফয়স লেক–বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, লালখান বাজার, টাংকির পাহাড়, বিজয়নগর, আমবাগান, বেলতলীঘোনা, মুরাদপুর রেলওয়ে পাহাড়, পাহাড়তলী ও উত্তর কাট্টলী ও বায়েজিদ বোস্তামী।
কত মানুষ ঝুঁকিতে
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী—চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ৩০টির বেশি পাহাড় ও টিলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪-১৫টি এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছে। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজারের বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় কাটার ফলে ঢাল দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভারী বৃষ্টিতে মাটি আলগা হয়ে ধস নামার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।
কেন বারবার পাহাড়ধস
বিশেষজ্ঞদের মতে পাহাড়ধসের প্রধান কারণ—অবৈধ পাহাড় কাটা, পাহাড়ের পাদদেশে ঘর নির্মাণ, ভারী ও টানা বর্ষণ
বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা
অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
চট্টগ্রামে পাহাড়ধস নতুন নয়। ২০০৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে আকবরশাহ, মতিঝর্ণা, বায়েজিদ, লালখান বাজার, ফয়স লেক ও পাহাড়তলী এলাকায় একাধিক পাহাড়ধসে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবার দুর্ঘটনার পর উচ্ছেদ অভিযান ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার আবারও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি গড়ে তোলে।
সমুদ্রবন্দরেও সতর্কতা
নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
ফরিদা |চখ
