ষোলশহরের রাতের আঁধারে মাটি ফেলে ‘পতু পুকুর’ ভরাট
নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন পশ্চিম ষোলশহরের নাজিরপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘পতু পুকুর’ ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনা ফেলে পুকুরটি অকেজো করে রাখা হয়। পরে চলতি বছরের কোরবানির ঈদের সময় রাতের আঁধারে ট্রাকে করে মাটি এনে পুকুরটি প্রায় সম্পূর্ণ ভরাট করা হয়। বর্তমানে ভরাট করা অংশে একাধিক ব্যক্তি স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পুকুরটি জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা মাদ্রাসার সামনে অবস্থিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এলাকার মানুষ দৈনন্দিন কাজে এই পুকুরের পানি ব্যবহার করতেন। বর্ষার সময় এটি জলধারণ করে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে পুকুরে আবর্জনা ফেলে এর অস্তিত্ব সংকুচিত করা হয়। সর্বশেষ ঈদের সময় ব্যাপকভাবে মাটি ফেলে জলাশয়টি প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। বর্তমানে সেখানে ভবনের ভিত্তি নির্মাণের কাজও চলছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুকুরটি রেকর্ডভুক্ত জলাশয় হওয়া সত্ত্বেও একটি প্রভাবশালী মহল এটি দখল করে বাণিজ্যিকভাবে প্লট তৈরির চেষ্টা করছে। স্থানীয়রা বাধা দিতে গেলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ করেছেন।
এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বি.এস. দাগ নম্বর ১০৪০১/১০৪০২ এবং খতিয়ান নম্বর ৩৫৫-এর আওতাভুক্ত ‘পতু পুকুর’ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অথচ সম্প্রতি কিছু ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বেআইনিভাবে পুকুরটি ভরাট করে প্লট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, স্থানীয়রা বাধা দিলে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগে পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, পুকুরটি বিলীন হলে এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে, অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির সংকট দেখা দেবে, একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে ভরাট কার্যক্রম বন্ধ এবং পুকুরটি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অভিযোগটি করেছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) চট্টগ্রাম বিভাগের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, নাজিরপাড়া এলাকাবাসীর পক্ষে।
তবে অভিযুক্তদের দাবি ভিন্ন। স্থানীয় অংশীদার জাহেদ শাহ বলেন, আমি পুকুরে কোনো কাজ করছি না। আগে থেকেই আমার একটি দোকান ছিল, সেটি ভেঙে গেছে। আমি পুকুরের পাড়ের অংশে নির্মাণকাজ করছি। এখানে প্রায় ৮২ জন অংশীদার আছেন। পুকুর ভরাটের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
আরেক অংশীদার মো. সাদমান বলেন, পুকুর কখন ছিল, তা আমি জানি না। আমরা বহু বছর ধরে এখানে ময়লা-আবর্জনা দেখছি। আমরা অংশীদার হিসেবে শুধু পাড়ের জায়গায় কাজ করছি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, পুকুর ভরাট করলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের বাইরে কোনো কিছু অন্তত আমার সময়ে হবে না। খাল, পুকুর ও জলাধার রক্ষা করতে হবে। কোথাও পুকুর ভরাট করে নির্মাণকাজ চলমান থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব পুকুর ইতোমধ্যে ভরাট হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সহযোগিতায় নগরের সব রেকর্ডভুক্ত পুকুর সংরক্ষণ ও উদ্ধারে আমরা কাজ করব।
পরিবেশবিদদের মতে, চট্টগ্রামে দ্রুত নগরায়ণের ফলে একের পর এক পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং নগরের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর। অতীতে বিভিন্ন স্থানে পুকুর ভরাটের ঘটনায় প্রশাসন ও আদালতের হস্তক্ষেপে জরিমানা, উচ্ছেদ এবং জলাশয় পুনরুদ্ধারের নজিরও রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে কয়েক দিনের মধ্যেই ‘পতু পুকুর’-এর অবশিষ্ট অংশও স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যাবে। তাই তদন্তসাপেক্ষে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঐতিহ্যবাহী জলাশয়টি পুনরুদ্ধারের জন্য তারা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
ফরিদা|চখ
