বিদেশি জাহাজের নির্ভরতা কাটিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ
🌍 ১০৪টি পতাকাবাহী জাহাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত, বছরে ৯ বিলিয়ন ডলার ভাড়া কমানোর সম্ভাবনা।
দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে কয়লা, ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ লোহা, জ্বালানি, সার এবং খাদ্যশস্য—সব ধরনের আমদানি-রপ্তানির প্রধান ভরসা সমুদ্রবন্দর। অথচ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই বিপুল বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে প্রতিবছর জাহাজভাড়া বাবদ প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি শিপিং কোম্পানির কাছে চলে যায়।
তবে গত কয়েক বছরে এই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন নৌপথে ১০৪টি বাংলাদেশি পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল করছে।
যদিও দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশ পণ্য এখন দেশীয় জাহাজে পরিবাহিত হয়, তবুও এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় বহর আরও সম্প্রসারণ করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, নৌপরিবহন দক্ষতা এবং কৌশলগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সমুদ্রগামী জাহাজ কী?
বাংলাদেশে নদীপথে হাজার হাজার কার্গো জাহাজ, লঞ্চ ও উপকূলীয় নৌযান থাকলেও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে এগুলো গণনা করা হয় না। এখানে বিবেচনায় আসে কেবল গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় বাণিজ্যিক জাহাজ বা মাদার ভেসেল, যেগুলো মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহন করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বহরে রয়েছে বাল্ক ক্যারিয়ার, তেল ও রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার এবং গ্যাসবাহী জাহাজ। কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা এখনও তুলনামূলক কম। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) পরিচালনা করছে সাতটি জাহাজ। বাকি ৯০ শতাংশেরও বেশি জাহাজ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পুনরুত্থান স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। একই বছরের জুন মাসে এমভি বাংলার দূত সংগ্রহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮২ সালে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৭টিতে পৌঁছায়।
পরবর্তী সময়ে অব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট এবং দীর্ঘদিন নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় একের পর এক জাহাজ বিক্রি বা অবসরে চলে যায়। ২০১৮ সালে কার্যকর জাহাজের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র দুটিতে।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে চীনের সরকারি ঋণে প্রায় ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি আধুনিক জাহাজ সংগ্রহের মাধ্যমে। নতুন বহরে যুক্ত হয় বাংলার অগ্রযাত্রা, বাংলার অগ্রদূত, বাংলার অগ্রগতি, বাংলার অর্জন, বাংলার জয়যাত্রা এবং বাংলার সমৃদ্ধি। এতে বিএসসি আবার লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলার সমৃদ্ধি ধ্বংস হওয়ায় বড় ধাক্কা খেতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। এরপরও অগ্রযাত্রা থেমে থাকেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে নৌভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসি ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে। সেই অর্থ দিয়েই ২০২৫ সালে দুটি আধুনিক আলট্রাম্যাক্স বাল্ক ক্যারিয়ার—বাংলার প্রগতি ও বাংলার নবযাত্রা—সংগ্রহ করে। বর্তমানে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা সাত।
এখন সংস্থাটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আরও ২২টি নতুন জাহাজ সংগ্রহ করা। পরিকল্পনায় রয়েছে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার, বাল্ক ক্যারিয়ার, কনটেইনার জাহাজ এবং মাঝারি আকারের তেলবাহী জাহাজ। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিএসসির বহর দাঁড়াবে ২৯টি জাহাজে।
বেসরকারি খাতেই সবচেয়ে বড় শক্তি
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের প্রধান চালিকাশক্তি এখন বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী। সবচেয়ে বড় বহরের মালিক কেএসআরএম গ্রুপ। তাদের ২৩ থেকে ২৮টি সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্প থেকে যাত্রা করে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিজেদের জাহাজেই স্ক্র্যাপ লোহা আমদানি করে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ কোভিড-১৯ মহামারির পর বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকটকে সুযোগে পরিণত করে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে প্রায় ২৫টি জাহাজের বহর গড়ে তুলেছে। এসব জাহাজের মাধ্যমে গম, চিনি, ক্লিংকার এবং শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন করা হয়।
অন্যদিকে কর্ণফুলী গ্রুপের এইচআর লাইন্স কনটেইনার পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে আটটি কনটেইনার ফিডার জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্ল্যাং রুটে নিয়মিত সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করছে তারা।
এছাড়া আকিজ, বসুন্ধরা, ভ্যানগার্ড মেরিটাইম এবং এমআই সিমেন্টসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ পরিচালনা করছে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়লেও দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশ এখনও দেশীয় জাহাজে পরিবাহিত হয়। ফলে অধিকাংশ পরিবহন ব্যয় বিদেশি কোম্পানির হাতেই থেকে যাচ্ছে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নৌপরিবহন নীতি, সহজ অর্থায়ন, বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, দক্ষ নাবিক তৈরি এবং কনটেইনার জাহাজে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশীয় শিপিং শিল্প আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
একসময় যেখানে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশের নিজস্ব জাহাজের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত, সেখানে আজ ১০৪টি পতাকাবাহী জাহাজ দেশের সক্ষমতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখনও পথ অনেক বাকি। তবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বড় বিনিয়োগ প্রমাণ করছে—বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুধু পণ্য উৎপাদনকারী দেশ নয়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিবহন খাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ফরিদা|চখ
