চট্টগ্রামের বনকাঁঠাল বিলুপ্তির পথে
গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত ফল বন কাঁঠাল। এটি গ্রাম্য ভাষায় বত্তা ফল হিসেবে পরিচিত। দেখতে অদ্ভুত টক-মিষ্টি স্বাদের এ ফলটি সবার পছন্দ। বর্তমানে ফলটি বিলুপ্তির পথে। তবে মধুমাসে এখনও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বনকাঁঠাল দেখতে পাওয়া যায়।

বর্তমানে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি গ্রাম ছাড়া খুব একটা দেখা মেলে না এই ফলের গাছ।
একসময় বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে গ্রামের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ, খোলা জমি ও বাগানে স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত বনকাঁঠাল গাছ। বনকাঁঠাল ছাড়াও গাব, ডুমুর, আতা, মেওয়াসহ নানা দেশীয় ফল ছিল সহজলভ্য।
মৌসুম এলেই শিশু-কিশোরেরা গাছের নিচে পড়ে থাকা পাকা বনকাঁঠাল কুড়িয়ে খেত। কাঁচা ফল লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া হতো, আর পাকা ফল দিয়ে তৈরি হতো আচার, চাটনি ও নানা মুখরোচক খাবার।

বনকাঁঠাল দেখতে কিছুটা কাঁঠালের মতো হলেও এর স্বাদ ও গন্ধ ভিন্ন। কাঁচা অবস্থায় টক এবং পাকা হলে টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল বেশ জনপ্রিয় ছিল গ্রামীণ জনপদে। তবে সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণ, বন-জঙ্গল উজাড়, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং বিদেশি ফলের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ায় দেশীয় এই ফলের গাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
এটি কাঁঠাল গাছের মতই বড় হয়। ফল ধরার আগে দেখে বোঝার উপায় থাকে না। বনকাঁঠাল গাছের আকার বড় কিন্তু ফল বেশ ছোট। খোসাটা বেশ পাতলা। এর শাঁসগুলো বেশ ছোট।
গ্রামে বন ধ্বংসের কারণে ডেউয়া বা বন কাঁঠাল দুর্লভ হয়ে পড়ছে। গ্রামগঞ্জে পাওয়া গেলেও শহুরে খুব একটা চোখে পড়ে না। গ্রীষ্মকালীন ফলের পাশাপাশি বাজারে দেখা মিলে বিলুপ্ত প্রায় এই ফল।
বনকাঁঠাল গাছ বহু শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট, বড় আকারের বৃক্ষ। প্রায় ২০-২৫ ফুট উঁচু হয়। এর ছাল ধূসর-বাদামী রঙের। গাছের ভেতর সাদাটে কষ বা আঠা থাকে। পাতা ৬-১২ ইঞ্চি লম্বা এবং ৪-৭ ইঞ্চি চওড়া হয়, যা অনেকটা কাক ডুমুরের পাতার মত । তবে আকারে সামান্য বড়।

স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা। স্ত্রী ফুল আকারে বড় ও মসৃণ। এর ফুলে পাপড়ি নেই, ছোট গুটিরমত। স্ত্রী ফুল থেকে ফল হয়। ফল কাঁঠালের ন্যায় যৌগিক বা গুচ্ছ ফল। বাইরের আবরণ অসমান। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হলুদ। ভিতরের শাঁস লালচে হলুদ। প্রতিটি শাঁসের মধ্যে একটি করে বীজ থাকে। সাধারণত মার্চ মাসে ফল আসে এবং মে মাসের শেষের দিকে ফল পাকতে শুরু করে। গাছ রোপনের উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল।
পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলেন, মধুর অম্ল যুক্ত পাকা ডেউয়া অরুচি ও পেটের বায়ুনাশে অমৃত। শুধু তাই নয়, পিত্ত ও যকৃতের জন্য উপকারী।
পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিনই বন্ধুদের নিয়ে বনকাঁঠাল বা বত্তা কুড়িয়ে খেতাম। তখন প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এই গাছ ছিল। এখন খুব কম দেখা যায়। বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছেলে-মেয়ে বনকাঁঠা চিনেই না।’
পটিয়ার পাহাড়ি এলাকা কেলিশহর গ্রামের বৃদ্ধ আহমদ ছফা বলেন, ‘ বনকাঁঠাল পাকার সময় বাড়িতে আচার বানানো হতো। এই ফলের স্বাদ অন্য কোনো ফলে পাওয়া যায় না। এখন গাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো আর পাওয়া যায় না।’
চট্টগ্রাম জেলার একাধিক কৃষি কৃষিবিদ বলেন-“দেশীয় ফল বনকাঁঠাল একটি পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণসম্পন্ন ফল। কিন্তু এর বাণিজ্যিক চাষ না থাকায় এবং মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় গাছটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এখনই গাছটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ ফল আরও দুর্লভ হয়ে যেতে পারে।
ফরিদা|চখ
