ফেরি করা সাইকেল নয়, যেন জীবন সংগ্রামের গল্প
চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুর ব্যস্ত সড়কে এগিয়ে চলেছেন এক মানুষ। কাঁধে নেই কোনো পদক, হাতে নেই ক্ষমতার ছড়ি। তবু তার প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি যুদ্ধের গল্প। পণ্যভর্তি সাইকেলটি ঠেলে তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে তিনি হয়তো কিছু প্লাস্টিকের সামগ্রী বহন করছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই সাইকেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ভাতের থালা, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ, আর আগামী দিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় তার দিন। সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন নগরের পথে। কখনো অলিগলি, কখনো ব্যস্ত সড়ক, কখনো বাজার, আবার কখনো মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে বিক্রি করেন গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী। দিন শেষে কত টাকা আয় হবে, আদৌ হবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ দারিদ্র্য অপেক্ষা করে না, ক্ষুধাও নয়।
শাহ আমানত সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলে শত শত গাড়ি। ব্যস্ত মানুষ তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করে। সেই ভিড়ের মধ্যেই নীরবে পথ চলে এই মানুষটি। হয়তো অনেকেই তাকে দেখেন, কিন্তু তার গল্পটি দেখেন না। দেখেন না তার ঘামে ভেজা মুখ, ক্লান্ত চোখ কিংবা অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনসংগ্রাম।
তবু এমন মানুষদের কাঁধেই টিকে থাকে সমাজের নীরব অর্থনীতি। তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নন, সংবাদ শিরোনামও হন না। কিন্তু তাদের শ্রমেই সচল থাকে জীবনের অগণিত চাকা। প্রতিদিনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তারা প্রমাণ করেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
ছবির মানুষটি হয়তো কোনো বক্তৃতা দেন না, কোনো দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নামেন না। কিন্তু তার ঘামে লেখা আছে সংগ্রামের এক অনন্ত ইতিহাস। পণ্যবোঝাই সাইকেল ঠেলে এগিয়ে চলা এই মানুষটি যেন বাংলাদেশের লাখো খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিচ্ছবি, যারা প্রতিদিন হার না মানার গল্প লিখে চলেছেন নীরবে, অদৃশ্যভাবে।
জীবন তাকে থামতে শেখায়নি। তাই ক্লান্ত শরীর, অনিশ্চিত আয় আর হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এগিয়ে চলেছেন। কারণ তিনি জানেন, জীবনের চাকা থেমে গেলে থেমে যাবে পরিবারের স্বপ্নও। আর তাই পথ যত দীর্ঘই হোক, সংগ্রাম যত কঠিনই হোক, তার চলার পথ থেমে থাকে না।
ফরিদা|চখ
