chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

২৯ নংপশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ড

সম্ভাবনার লাইফলাইন, সংকটের গোলকধাঁধা

ব্যস্ত সাইরেন, চাকার ঘর্ষণ, ভারী লোহার ঠোকাঠুকি আর হাজারো শ্রমিকের হাঁকডাক চট্টগ্রামের ২৯ নম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ী ওয়ার্ডের চব্বিশ ঘণ্টার চেনা ছবি এটি। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের প্রধান রেলস্টেশনের কোল ঘেঁষে থাকা মাত্র ০ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র জনপদটি কেবল একটি সাধারণ এলাকা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘লাইফলাইন’। কিন্তু এই বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তীব্র যানজট আর জলাবদ্ধতার এক দীর্ঘশ্বাসের নামও পশ্চিম মাদারবাড়ী।
আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অঞ্চলের প্রায় ৪৫ হাজার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মনে এখন নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা। কেমন আছে অর্থনৈতিক এই হাব, আর কী ভাবছেন এখানকার সম্ভাব্য কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা?
একদিকে দেশের বৃহত্তম পরিবহন হাব, অন্যদিকে পাইকারি ও মাঝারি শিল্পের প্রধান সংযোগস্থল হিসেবে পশ্চিম মাদারবাড়ী ধারণ করে আছে এক বিশাল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। কদমতলী মোড় থেকে শুরু করে ঢাকা ট্রাংক রোড (ডিটি রোড) এলাকা জুড়ে চোখ গেলেই দেখা যাবে শত শত লজিস্টিকস ও ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির সাইনবোর্ড। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ভারী কাঁচামাল, ইস্পাত, স্ক্র্যাপ লোহা এবং সিমেন্ট প্রথমে এসে জমা হয় মাদারবাড়ী ট্রাক-কার্গো স্টোরেজ ও স্থানীয় ডিপোগুলোতে। এরপর এখান থেকেই পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ছুটে যায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
পশ্চিম মাদারবাড়ীর একপাশে মাঝিরঘাট যা অশোধিত ও শোধিত লবণের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। অন্যপাশে কদমতলী ও ডিটি রোড এলাকা যা স্ক্র্যাপ মেটাল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং করাতকলের (স মিল) বিশাল হাব। এই কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে এক দারুণ অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র অর্থনীতি। তবে মুদ্রার ওপিঠ বলছে অন্য কথা। সুনির্দিষ্ট পার্কিং টার্মিনাল না থাকায় দিনভর লেগে থাকে তীব্র যানজট। আর বর্ষা বা জোয়ারের সময় কর্ণফুলী নদীর পানি ঢুকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয় পাইকারি গুদামগুলোতে।
এলাকার এই দীর্ঘদিনের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন সম্ভাব্য কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা।
সদরঘাট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, “করোনাকালে কিংবা দেশের যেকোনো দুর্যোগে আমি নিজস্ব অর্থায়নে ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জন্য কাজ করেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। আগামীতেও এই সেবার ধারা বজায় রাখতেই আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমাদের সিটি মেয়র শাহাদাত ভাইয়ের সহযোগিতায় আমার ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকার খাল খনন ও উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে। নির্বাচিত হলে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া ওয়ার্ডের সরু রাস্তাগুলো প্রশস্ত করা, মাদক নির্মূল করে যুবসমাজকে কর্মমুখী করা এবং নিজস্ব অর্থায়নে পুরো ওয়ার্ডকে সিসি ক্যামেরার আওতায় এনে ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমার। একই সাথে ওয়ার্ডে একটি নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অবহিত করেছি।”

২৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন বলেন, “বর্তমানে আমাদের ওয়ার্ডটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু কিংবা ওয়ারিশ সনদ নিয়ে মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আমি নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে এই প্রশাসনিক ভোগান্তি দূর করা। এছাড়া মাদক নির্মূল, ভেঙে যাওয়া সড়ক সংস্কার এবং ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমি বদ্ধপরিকর। আগে এখানে প্রবীণদের হাঁটার জন্য একটি ওয়াকওয়ে ছিল, যা এখন নেই; আমি সেটি পুনরায় চালু করব এবং শিশুদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করব। এই ওয়ার্ডে একটি বালিকা বিদ্যালয় থাকলেও ছেলে-মেয়েদের জন্য সাধারণ কোনো হাইস্কুল বা কলেজ নেই, তা প্রতিষ্ঠায় আমি জোর দেব। দল সমর্থিত প্রার্থী হতে পারলে ভালো, তবে দল সমর্থন না দিলেও আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।”
২৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, “ভৌগোলিক কারণে আমাদের ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা অন্য এলাকার চেয়ে কিছুটা কম হলেও, ‘গোলজার খাল’ এর অব্যবস্থাপনার কারণে বর্ষা ও জোয়ারে কিছু নিচু এলাকায় পানি জমে যায়। আমি নির্বাচিত হলে আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে গোলজার খালে একটি আধুনিক ‘স্লুইস গেট’ নির্মাণ করা। এছাড়া এই বিপুল জনসংখ্যার ওয়ার্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য কোনো কলেজ নেই। আমি চসিকের সহযোগিতায় এখানে একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ভারী যানবাহনের কারণে রাস্তাগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই রাস্তা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত মেরামতের স্থায়ী ব্যবস্থা করব এবং ফুটপাত হকারমুক্ত রাখব।”
২৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব মো. শাহজাহান বলেন, “একটি সুস্থ সমাজের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। অতীতে এই ওয়ার্ডে একটি ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ ছিল, যা দখল করে বাস টার্মিনাল করা হয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে ‘বালুর মাঠ’ এলাকাটিকে উদ্ধার করে শিশু ও প্রবীণদের জন্য একটি আধুনিক মাঠ ও উন্মুক্ত পার্ক হিসেবে গড়ে তুলব। বিগত দিনগুলোতে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি করে চাঁদাবাজির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন। নির্বাচিত হলে এলাকাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও কিশোর গ্যাংমুক্ত করা হবে। পাশাপাশি এখানে একটি নতুন বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ স্থাপন করা হবে। তবে আমি দলের সিদ্ধান্তই মেনে নেব এবং আমাদের ত্যাগী নেতা সালাউদ্দিন ভাই যদি নির্বাচন করেন, তবে আমি ওনার সম্মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াবো।”
সদরঘাট থানা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক ফজলে এলাহী মো. শাহিন বলেন, “পশ্চিম মাদারবাড়ী অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের চেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই এখানকার প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং জানমালের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে যে চাঁদাবাজি হয়, তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। এছাড়া জোয়ারের পানিতে ব্যবসায়ীদের পণ্য নষ্ট হওয়া রোধে জলাবদ্ধতার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান এবং সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমাতে আমি কাজ করতে চাই।”
এক নজরে ২৯ নম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ী ওয়ার্ড
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এটি চসিকের সদরঘাট থানার আওতাধীন এবং জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম-১১ নির্বাচনী এলাকার অংশ।
ওয়ার্ডের আয়তন শন্য দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার। এখানে জনঘনত্ব প্রায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫৯ হাজার মানুষ (চসিকের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা)। শিক্ষার হার ৬৪.৯ শতাংশ।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম মাদারবাড়ী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ এবং সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
অর্থনৈতিক লাইফলাইন সচল রাখতে পশ্চিম মাদারবাড়ীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে এই জোনের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সুশৃঙ্খল ট্রাক টার্মিনাল। স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা, আগামীতে যিনিই কাউন্সিলরের চেয়ারে বসবেন, তিনি যেন এই অর্থনৈতিক হাবের সংকট দূর করে মাদারবাড়ীকে একটি আধুনিক ও নিরাপদ ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলেন।

এই বিভাগের আরও খবর