chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামে কুরবানির ঈদে সরগরম টুপি-আতরের বাজার

পবিত্র ঈদ-উল-আযহা বা কুরবানির ঈদ দরজায় কড়া নাড়ছে। মহানগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে শুরু করে হাটহাজারী বা পটিয়ার গ্রামীণ বাজার—সবখানেই এখন ঈদের আমেজ। কুরবানির পশুর হাটের পাশাপাশি সমানতালে জমিয়ে উঠেছে টুপি, আতর, জায়নামাজ ও তসবির বাজার। বন্দরনগরীর অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফুটপাতগুলোতে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। শহরের নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদ, চকবাজার, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে জমজমাট কেনাবেচা। একই চিত্র দেখা গেছে পটিয়া, হাটহাজারী, রাউজান, মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও আনোয়ারা উপজেলার হাটবাজারগুলোতেও।

চট্টগ্রাম নগরীর টুপি-আতরের সবচেয়ে বড় পাইকারি ও খুচরা বাজার বসেছে ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজার, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মার্কেট এবং চকবাজার এলাকায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ-উল-ফিতরের তুলনায় কুরবানির ঈদে পোশাকের চেয়ে টুপি ও সুগন্ধির চাহিদা বেশি থাকে।

বাজারে এবার সুতি, জর্জেট এবং সিল্কের কাপড়ের ওপর হাতের কাজের টুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ওমানি, ইন্দোনেশিয়ান এবং ওয়ান-পিস পাকিস্তানি টুপির দিকে তরুণদের ঝোঁক বেশি। সাধারণ সুতি টুপি মিলছে ৫০ থেকে ২০০ টাকায়, আর কারুকার্যখচিত ওমানি বা জুব্বা টুপি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত।

চকবাজারের এক টুপি বিক্রেতা বলেন, “ঈদ আসলেই আমাদের বেচাকেনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবারও শুরু থেকেই ভালো সাড়া পাচ্ছি। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকার বেশি দামের টুপিও বিক্রি হচ্ছে।”

আতরের বাজারে এবারও রাজত্ব করছে দুবাই ও সৌদি আরবের সুগন্ধি। ‘উদ’, ‘আম্বার’, ‘হাজরে আসওয়াদ’ এবং ‘বকুল’ আতরের চাহিদা তুঙ্গে। ৩ মিলিগ্রামের ছোট কাঁচের শিশি মিলছে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত (ব্র্যান্ড ও মানভেদে)।

ক্রেতারা জানান, ঈদের নামাজ ও ধর্মীয় পরিবেশে আতর ব্যবহার একটি ঐতিহ্য, তাই নতুন আতর কেনার প্রতি আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে।

চকবাজারের বাসিন্দা আসিফুল হক দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, “কুরবানির ঈদে নতুন জামা তেমন কেনা না হলেও, ঈদের নামাজের জন্য একটা নতুন টুপি আর ভালো আতর চাই-ই চাই। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও আন্দরকিল্লায় এসেছি টুপি কিনতে।”

রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আলহাজ্ব হারুনুর রশীদ বলেন, “কুরবানির ঈদে মানুষ পোশাক কম কিনলেও টুপি, আতর আর জায়নামাজ কেনাটাকে সুন্নাত এবং ঐতিহ্যের অংশ মনে করে। রিয়াজউদ্দিন বাজারে আমরা এবার রমজানের ঈদের চেয়েও বেশি টুপির কালেকশন রেখেছি। গত এক সপ্তাহে আমাদের পাইকারি বিক্রি খুব ভালো হয়েছে, এখন খুচরা ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। চাঁন রাত পর্যন্ত দম ফেলার সময় পাব না আশা করি।”

মহানগরের বাইরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলাগুলোতেও ঈদের কেনাকাটা পুরোদমে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে হাটহাজারী, পটিয়া, সীতাকুণ্ড, রাউজান ও চন্দনাইশ সদরের বড় বড় মার্কেটগুলো এখন উৎসবমুখর।

হাটহাজারী ও পটিয়ার মতো এলাকাগুলোতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বেশি থাকায় তসবি ও জায়নামাজের বিক্রি গত কয়েকদিনের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

হাটহাজারী উপজেলার খুচরা টুপি-আতর বিক্রেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বলেন, “হাটহাজারীতে বড় মাদরাসা ও ধর্মীয় আবহ থাকার কারণে এখানে আতর এবং তসবির চাহিদা সবসময়ই একটু বেশি থাকে। এবার তরুণদের মধ্যে হালকা ও মিষ্টি ঘ্রাণের আতরের চাহিদা বেশি, যেমন—’হোয়াইট মাস্ক’ বা ‘বকুল’। আর ছোট বাচ্চাদের জন্য কার্টুন ও চুমকি বসানো টুপিগুলো খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।”

পটিয়া উপজেলার ক্রেতা মোহাম্মদ রিদওয়ান বলেন, “শহরের চেয়ে আমাদের পটিয়া সদরের মার্কেটগুলোতেই এখন ভালো মানের টুপি-আতর পাওয়া যাচ্ছে। আগে একটা ভালো সুগন্ধি কিনতে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হতো, এখন ঘরের কাছেই ওমানি টুপি আর দুবাইয়ের আতর পাচ্ছি। তবে গতবারের চেয়ে এবার দামটা কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।”

উপজেলার ক্রেতারা যাতায়াত খরচ ও ভিড় এড়াতে এখন স্থানীয় বাজারগুলোতেই বেশি ভিড় করছেন।

সীতাকুণ্ডের স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লোকমান বলেন, “শহরের চেয়ে আমাদের এখানে দাম কিছুটা কম থাকায় আশপাশের গ্রামের মানুষ এখানেই চলে আসছে। বেচাবিক্রি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।”

বিক্রেতাদের মতে, রমজানের শেষ দিক থেকে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত টুপি ও আতরের বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। এই সময়টিকে তারা মৌসুমী ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করেন।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার টুপি ও আতরের দাম ১০% থেকে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের এলসি জটিলতা ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিক্রেতারা। তবে দাম কিছুটা চড়া হলেও উৎসবের আনন্দে ভাটা পড়েনি। পছন্দের টুপি আর আতর কিনে হাসিমুখেই বাড়ি ফিরছেন ক্রেতারা।

চট্টগ্রাম জেলা বাজার মনিটরিং সেল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, “ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধির কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে এবার আমদানিকৃত আতর ও টুপির দাম গত বছরের চেয়ে ১০-১৫% বেড়েছে। তবে আমরা ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছি, ঈদের এই পবিত্র সময়ে যেন অতিরিক্ত মুনাফা না করা হয়। জেলা ও উপজেলার বাজারগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে।”

স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে টুপি ও আতরের বাজারে কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয় উৎস হিসেবে কাজ করে।

ব্যবসায়ীদের আশা, আগামী ২-৩ দিনে অর্থাৎ চাঁন রাত পর্যন্ত বিক্রির এই ধারা আরও বাড়বে এবং এবারের ঈদে রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা সফল হবে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরে।

চট্টগ্রামের সিটি ও উপজেলা জুড়ে এখন ঈদের আবহ—টুপির নতুন ডিজাইন আর আতরের সুবাসে ভরে উঠেছে পুরো বাজার।

তাসু/চখ

এই বিভাগের আরও খবর