chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

মধ্যবিত্তের কুরবানির ঈদ এখন দীর্ঘশ্বাসের গল্প

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেও চট্টগ্রামের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ঘরে নেই কোনো ঈদের আমেজ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এবার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছেন নগরের এক বিশাল অংশের মানুষ। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম যেমন চড়া, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মসলাসহ অন্যান্য অনুষঙ্গের খরচ। ফলে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, ঈদের দিন পরিবার নিয়ে দুমুঠো ভালো খাবার খাওয়া নিয়েই শঙ্কায় আছেন অনেকে।

খাদ্যদ্রব্য, গোখাদ্য, পরিবহন ও চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধির কারণে এবার পশুর দাম গত বছরের তুলনায় ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও হাট সংশ্লিষ্টরা।

নগরের বহদ্দারহাট, সাগরিকাসহ কয়েকটি পশুর বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার ছোট সাইজের একটি গরুর দামও হাঁকা হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ওপরে। এর নিচে কোনো সুস্থ পশু মিলছে না।

সাগরিকা হাটে আসা এক দিনমজুর আব্দুল করিম বলেন, “গত বছর যে গরু ৭০–৮০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার একই ধরনের গরুর দাম ১ লাখের কাছাকাছি। আমাদের মতো মানুষের জন্য কোরবানি দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।”

অন্যদিকে গৃহকর্মী সালমা বেগম বলেন, “সংসারের খরচই চালানো কষ্ট, গরু কেনা তো দূরের কথা। এবার হয়তো কোরবানি করা হবে না।”

আগ্রাবাদের একটি বেসরকারি ব্যাংকের জুনিয়র কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ বলেন, “বাইরে থেকে আমাদের জীবনটা দেখতে খুব চাকচিক্যময় মনে হলেও ভেতরের খবর কেউ জানে না। সীমিত বেতন, কিন্তু প্রতি মাসে বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুলের খরচ আর বিদ্যুৎ বিল দিতেই হিমশিশ খেতে হয়। গত বছরও একটা গরুতে তিন ভাগে শরিক হয়েছিলাম। এবার শরিকদের প্রত্যেকেই বলছেন বাজেট বাড়াতে, কারণ ১ লক্ষ টাকার নিচে কোনো গরুই নেই। কিন্তু আমার পক্ষে তো বেতন বাড়ানো সম্ভব না। সৎভাবে চাকরি করে এই বাজারে কোরবানি দেওয়া এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে বলতেও পারছি না যে এবার কোরবানি দিতে পারছি না।”

জিইসি মোড়ের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা নুসরাত জাহান দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, “মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—আমরা গরিবদের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ওএমএসের (OMS) চাল কিনতে পারি না, আবার ধনীদের মতো বাজারে গিয়ে দাম না দরে কেনাকাটাও করতে পারি না। ঈদের বোনাস যা পেয়েছি, তা দিয়ে এক মাসের বাজারের খরচই উঠছে না। কাঁচাবাজারে মসলার যে দাম, মনে হচ্ছে মাংস কেনার আগেই মসলা কিনতেই পকেট খালি হয়ে যাবে। সন্তানদের আবদার থাকে ঈদে কোরবানি হবে, আনন্দ হবে। কিন্তু এবার হয়তো তাদের বোঝাতে হবে যে, পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। মধ্যবিত্তের ঈদ এখন শুধু মুখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলার দিন।”

নাসিরাবাদ এলাকার একটি বায়িং হাউজের সেকশন ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “গত কয়েক বছরে সবকিছুর দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে, কিন্তু আমাদের বেতন কি বেড়েছে? মোটেও না। কোরবানি দেওয়াটা আমাদের জন্য শুধু ধর্মীয় রিওয়াজ নয়, আত্মমর্যাদারও একটা বিষয়। কিন্তু এবার পশুর হাটের যে চড়া দাম, তাতে একা গরু কেনা তো দূর, ভাগে দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ছাগল কিনতে গেলেও ১৫-২০ হাজার টাকা লাগছে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে মুখ দেখানোই দায় হবে এবার। উৎসবের আনন্দটা এখন এক ধরণের সামাজিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে আমাদের ওপর।”

কোতোয়ালী এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পিয়ন মো. ইব্রাহিম বলেন, “গত বছরও চারজন মিলে ভাগে কোরবানি দিয়েছিলাম। এবার ভাগে শরিক হওয়ার মতো টাকাও হাতে নেই। চাল, ডাল, তেল কিনতেই বেতন শেষ হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড় দেওয়া তো দূরের কথা, ঈদের দিন একটু সেমাই-চিনি কেনার বাজেট মেলাতেই হিমশিম খাচ্ছি।”

শুধু কোরবানির পশুই নয়, কোরবানি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং গরম মসলার দাম গত এক মাসে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

পাহাড়তলী বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম দৈনিক চট্টলার খবরকে বলেন, “পাইকারি বাজারেই সবকিছুর দাম বাড়তি। আমরা বেশি দামে কিনে কম দামে বেচবো কীভাবে? কাস্টমাররা বাজারে এসে দাম শুনেই রাগ করে চলে যাচ্ছেন। আগে যারা কেজি ধরে মসলা কিনতেন, তারা এখন ২৫-৫০ গ্রাম করে কিনছেন।”

নগরের চকবাজার এলাকায় রিকশা চালান মো. মনসুর আলী। ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের মতো গরিবের জন্য কোরবানি এখন স্বপ্ন। দিনে যা আয় করি, তা দিয়ে চাল-সবজি কিনতেই ফুরিয়ে যায়। ভাবছিলাম একটা ছাগল হলেও কিনবো, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি ছোট একটা ছাগলের দামও ১৫-২০ হাজার টাকা। এবার আর কোরবানি দেওয়া হবে না।”

একই সুর শোনা গেল আগ্রাবাদের পোশাক কারখানার কর্মী রেহানা আক্তারের কণ্ঠে, “বোনাস যা পেয়েছি, তা দিয়ে বাড়িভাড়া আর আগের দোকান বাকি শোধ করেছি। বাজারে সবকিছুর যে চড়া দাম, তাতে কোরবানি দেওয়া আমাদের মতো মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এখন আশা শুধু একটাই—ধনীরা কোরবানি দিলে যদি কিছু মাংস কপালে জোটে।”

পাঠানটুলীর দিনমজুর লাল মিয়া বলেন, “আগের দিনগুলোতে কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকেই ঘরে একটা উৎসবের ভাব থাকত। ছেলেমেয়েরা জিজ্ঞেস করত—বাবা, এবার কী কিনবা, গরু নাকি ছাগল? আর এবার ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, অথচ ঘরে চাল কেনার টাকাই নাই। বাজারে সবকিছুর যে আগুন দাম, তাতে আমাদের মতো মানুষের কোরবানি দেওয়ার আশা করাটাই পাপ। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না, বুকটা ফেটে যায়।”

বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের পাশে ফুটপাতের চা বিক্রেতা সখিনা বেগম বলেন, “আমার স্বামীটা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায়। চা বেচে কোনোমতে সংসার টানি। গত বছরও অনেক কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে একটা ভাগে শরিক হয়েছিলাম। এবার ভেবেছিলাম একটা ছোট ছাগল কিনব। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি একটা মাঝারি সাইজের ছাগলের দাম ২০ হাজার টাকা! এই টাকা দিয়ে আমি তিন মাসের সংসার চালাতে পারব। অগত্যা কোরবানি দেওয়ার আশা বাদ দিয়েছি। এখন শুধু আল্লাহকে ডাকি, ঈদের দিন যেন সন্তানদের পাতে অন্তত একটু ভালো খাবার তুলে দিতে পারি।”

পাহাড়তলী রেলওয়ে কোয়ার্টার এলাকার ভ্যানচালক মো. ইউনুস বলেন, “সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যা পাই, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতেই পকেট খালি। কোরবানির বাজারে গিয়েছিলাম শুধু দাম দেখতে, গরু ছোঁয়ার সাহসও হয়নি। একটা ছোট সাইজের গরুর দাম চাচ্ছে ৯০ হাজার টাকা! বড়লোকেরা হাসিমুখে টাকা দিয়ে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। আমাদের ঈদ মানে শুধু ধনীদের ঘরের মাংসের দিকে চেয়ে থাকা। গরিবের কোনো ঈদ নাই রে ভাই, গরিবের ঈদ শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায়।”

কালুরঘাট এলাকার একটি জুট মিলের শ্রমিক আবদুল করিম বলেন, “রোজার ঈদে বাচ্চাদের নতুন জামা দিতে পারি নাই, ভাবছিলাম কোরবানির ঈদে অন্তত একটা ছাগল কিনে কোরবানি দেব। কিন্তু বোনাস আর বেতনের যা অবস্থা, তা দিয়ে বকেয়া ঘরভাড়া দিতেই শেষ। বাজারে মসলা কিনতে গেলেও হাত কাঁপে। পেঁয়াজ-আদার দাম শুনলে মনে হয় এগুলো সোনার চেয়েও দামি। কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, ঈদের দিন সেমাই রান্না করার মতো সামর্থ্যও এবার আমাদের অনেকের নেই। উৎসবের দিনটাই এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণার দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

চট্টগ্রামের স্থানীয় সমাজকর্মী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক এই চরম মন্দাভাব সমাজের নিম্নবিত্তদের ওপর মানসিক ও সামাজিকভাবে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ঈদের আনন্দ যেখানে সবার হওয়ার কথা, সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য তা গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে।

বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার না থাকায় সিন্ডিকেট চক্র উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলে। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ওএমএস (OMS) বা বিশেষ সরকারি সহায়তার পরিধি না বাড়ালে উৎসবের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের টেবিল শূন্যই থেকে যাবে।

চট্টগ্রামের পশুর বাজারগুলোতে বিপুল পরিমাণ গবাদিপশুর আমদানি থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের খালি পকেট আর বাজারের চড়া দামের কারণে এবারের কোরবানি অনেকের কাছেই কেবলই দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর