chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

কোটি টাকার কাঠের ট্রলার নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলীতে

নিজস্ব প্রতিবেদক: শ্রমিকের হাতুড়ির জোরে পেরেক ঢুকছে কাঠের তক্তার বুকে, সেই বুকে তক্তার বুকে বসছে রঙের প্রলেপ। কেউবা ঢুকানো পেরেকের ছিদ্রের অংশে তুলা এবং পুটিং দিয়ে দিচ্ছে। কাঠের মৃসণ ফুটিয়ে তুলতে আধুনিক ইলেকট্রিক মেশিনে কাজ করে চলেছেন অনেকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেউবা শুনছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান। কোথাও যেনো বসে থাকার জো নেই।

শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নিপুন হাতে এগিয়ে চলছে সমুদ্র বুকে দাপিয়ে বেড়ানো নৌযান ফিসিং ট্রলার (মাছ ধরার নৌকা) তৈরির কাজ। রোরে উত্তাপ থেকে বাঁচতে মাথায় গামছা বেঁধে নিয়েছেন। কর্ণফুলী নদীর রাজাখালী খালের মোহনায় তৈরি হচ্ছে এসব নৌযান। প্রায় অর্ধশত শ্রমিকের ব্যস্ততায় চলছে নৌযান নির্মাণের কাজ। এরমধ্যে বেশ কিছুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

কোটি টাকার কাঠের ট্রলার নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলীতে
শ্রমিকদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার ট্রলার। নির্মাণ শেষে এসব ট্রলার ছুটে বেড়াবে সাগরে। কর্ণফুলীর রাজাখালী মোহনা থেকে ছবিটি তুলেছেন নিজস্ব আলোকচিত্রী এম ফয়সাল এলাহী

আস্ত একটি ফিসিং ট্রলার পেছনের অংশে হাতুড়ির পেরেকের কাজ করছিলেন পটিয়ার শান্তিরহাটের বাসিন্দা স্বপন কান্তি নাথ। প্রায় ২৪ বছরের বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে তৈরি করে চলেছেন ট্রলারের কাজ। কর্ণফুলী নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিতালী তার। চাক্তাই খালের মোহনায় স্বপন নামে পরিচিত তিনি। কোনো রকম অভিজ্ঞতা ছাড়াই এ পেশায় হাতেখড়ি। তিনি দৈনিক ৯০০ টাকা মজুরিতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেন। তার মতো ১০ থেকে ১২ জনের শ্রমিকের কেউ কাঠের কাজ, কেউ খাল পার শ্রমিক এবং কেউ ইঞ্জিনের কাজ করে থাকেন। একটি পূর্ণাঙ্গ নৌযান ফিসিং বোট তৈরিতে তিন থেকে চার মাসের বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়ে। নির্মাণ শেষে এসব ট্রলার চাক্তাই খালের মোহনায় রাখা হয়। লাইসেন্স পেলে সাগরে মাছ ধরতে বের হয় এসব ট্রলার । কারিগরের দেখানে নির্দেশনায় চলে শ্রমিকের যাবতীয় কাজ।

কোটি টাকার কাঠের ট্রলার নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলীতে
শ্রমিকদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার ট্রলার। নির্মাণ শেষে এসব ট্রলার ছুটে বেড়াবে সাগরে। কর্ণফুলীর রাজাখালী মোহনা থেকে ছবিটি তুলেছেন নিজস্ব আলোকচিত্রী এম ফয়সাল এলাহী

স্বপন কান্তি চট্টলার খবরকে বলেন, এক সময় এখানকার বোট তৈরির বেশ সুনাম ছিল। দেশের সমুদ্রসীমা বেড়ে যাওয়ায় ট্রলার নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়। বিশ্ব মানের বোট এখন এখানে বানানো হচ্ছে। এসব ট্রলার আট থেকে দশ বছর বিনা মেরামতে সাগরে মাছ ধরার কাজ করতে পারে। গভীর সমুদ্র যাত্রায় এসব নৌযান ১২শ কিলোমিটার পাড়ি ওেয়ায় সামর্থ্য রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে অনেকেই এ পেশায় যুক্ত হতে থাকেন। এদের মধ্যে মমিন সারেং অন্যতম। এক সময় নগরের ফিশারীঘাটে জাতীয় সমিতির জাহাজের অধীনে সারেং এর কাজ করতেন মমিন। ১৫ বছর সারেং এর কাজের পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। ওই সময় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় ফিসিং ট্রলার ভাড়া দিতেন মালিকরা। চুক্তি অনুযায়ী অনেকেই নৌযান ভাড়া নিয়ে অনেকে এ পেশায় নাম লেখান। মমিন সারেং প্রথম দিকে বোট ভাড়া নেওয়ার পর সময়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার বাড়ানোর দিকে মন দেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার দেউদীঘি এলাকার এই বাসিন্দা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে নৌযান পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

কোটি টাকার কাঠের ট্রলার নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলীতে
শ্রমিকদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার ট্রলার। নির্মাণ শেষে এসব ট্রলার ছুটে বেড়াবে সাগরে। কর্ণফুলীর রাজাখালী মোহনা থেকে ছবিটি তুলেছেন নিজস্ব আলোকচিত্রী এম ফয়সাল এলাহী

সদ্য তৈরি করা একটি ট্রলারের পাশে বসে ছিলেন মমিন সারেং। শ্রমিকদের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। কথার প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বলেন, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি বান্দরবান থেকে কয়েক বছর আগের আগেও হাড়গজা ( স্থানীয় নাম আজবী),চাম্বল, ত্রিশূল, চাপালিশ, সেগুন, গামারি,বইলাম, ছাতিম প্রজাতি গাছ দিয়ে ট্রলারের কাজ করা হতো। পাহাড়ি এলাকা থেকে এসব কাঠ কাপ্তাই উপজেলা হয়ে চট্টগ্রামে ঢুকতো। কিন্তু  স্থানীয়ভাবে চাষ না হওয়ায় এসব গাছ আমদানি করে আনা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে হয়েছে। গত বছরে প্রতি ফুট আজবী গাছ ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকায়। চাম্বল বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। ইঞ্জিনের জন্য চিন থেকে আনা মেশিনটিও দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে।

এক প্রশ্নের উত্তরের তিনি বলেন, একটি জাহাজ নির্মাণের প্রথমেই কাঠগুলোকে নির্দিষ্ট আকারে কাটা হয়। শুরুতেই নৌযানের রদ (পেছনের অংশ) এবং মাতি (সামনের অংশ) নির্মাণের কাজ করেন। পেছনের রদ অংশ ইঞ্জিনের ঘূর্ণনে ট্রলার পানিতে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এরপর চাঁদা, বাহা, গোসা তৈরি করে নৌযানকে প্রাথমিক কাঠামো দেওয়া হয়। ওই কাঠামোতে তক্তা লাগিয়ে তিনপাশ সম্পূর্ণ করে। ট্রলারের নিচ দিয়ে পানি ঢুকতে না পারার জন্য তক্তা লাগানোর পর পেরেকের ছিদ্র অংশে প্রথমে পুটিং এবং তুলে দিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

কোটি টাকার কাঠের ট্রলার নির্মাণ হচ্ছে কর্ণফুলীতে
শ্রমিকদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার ট্রলার। নির্মাণ শেষে এসব ট্রলার ছুটে বেড়াবে সাগরে। কর্ণফুলীর রাজাখালী মোহনা থেকে ছবিটি তুলেছেন নিজস্ব আলোকচিত্রী এম ফয়সাল এলাহী

সর্বশেষ কাঠের কাঠামোতে ইঞ্জিন সংযোগ করার পর নিচের অংশে আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। এখানে ৭০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকার নৌযান ট্রলার নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে কাঠ শ্রমিককে ১০ লাখ টাকা, ইঞ্জিনের মেশিনের দাম পড়ে ১২ লাখ টাকা পড়ে। গত বছর পাঁচটি ট্রলার বানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী ট্রলার মালিক সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ করার শর্তে জানান, করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের ট্রলার মালিকদের লোকসান গুনতে হয়েছে। গত বছরে একশোর মতো ট্রলার নির্মাণ করা হয়েছে। বর্ষাকাল আসলে ট্রলার নির্মাণ আরও বেড়ে চলেও জানান তিনি।

আরকে/এমকে/চখ

এই বিভাগের আরও খবর
Leave A Reply

Your email address will not be published.