chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

প্রথম ধাপে ৯ কনটেইনার নারায়ণগঞ্জে

২৩ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরছে বিপজ্জনক রাসায়নিক

দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে এসব রাসায়নিক ধ্বংস করা হবে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে রাসায়নিকবাহী গাড়িগুলো পুলিশ প্রহরায় নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয়। কাস্টমস হাউস চট্টগ্রামের ধ্বংস কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম শুরু হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মো. রাসেল আহমেদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা নয়টি কনটেইনারের বিপজ্জনক রাসায়নিক পরিবেশসম্মতভাবে ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে থাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। পাশাপাশি দীর্ঘদিন কনটেইনার আটকে থাকায় বন্দরের ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছিল।

কী আছে এসব কনটেইনারে

প্রথম ধাপে পাঠানো রাসায়নিকের মধ্যে রয়েছে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, মিথানল ও থিনার। কাস্টমসের দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৩ সাল থেকে বন্দরে পড়ে থাকা এসব পণ্যের পরিমাণের মধ্যে রয়েছে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার।
তবে প্রথম চালানে পাঠানো পণ্যের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। কাস্টমসের একটি তথ্য অনুযায়ী, নয় কনটেইনারের মোট ওজন ১৫০ দশমিক ৮৯ টন। অন্যদিকে প্রথম চালানে প্রায় ১০৬ টন রাসায়নিক পাঠানো হয়েছে বলে কাস্টমস সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

কেন এত দিন বন্দরে

আমদানির পর বিভিন্ন আইনি জটিলতা, মামলা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস না হওয়ায় এসব রাসায়নিক দীর্ঘদিন বন্দরে আটকে ছিল। সময়ের সঙ্গে পণ্যগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে এগুলো আর সাধারণ প্রক্রিয়ায় খালাস বা বিক্রি করার সুযোগ ছিল না; ধ্বংসের প্রয়োজন দেখা দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পণ্য পড়ে থাকায় শুধু জায়গা দখল নয়, নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে দাহ্য বা ক্ষয়কারী রাসায়নিকের ক্ষেত্রে কনটেইনার পুরোনো হয়ে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক পণ্যের বিষয়টি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে শত শত প্যাকেজ ও কনটেইনারে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পড়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

বন্দরের সক্ষমতার ওপর চাপ

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এখানে দীর্ঘদিন খালাস না হওয়া পণ্য পড়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ইয়ার্ডের জায়গা কমে যায়। এতে নতুন পণ্য ওঠানামা ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বন্দর সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইয়ার্ডগুলোতে বিপুল পরিমাণ এলসিএল কার্গো, বাল্ক পণ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পণ্য ২৩ বছর পর্যন্ত পুরোনো।

এ অবস্থায় পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে একদিকে যেমন বন্দরের নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে ইয়ার্ডের জায়গাও খালি হবে।

একাধিক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ

রাসায়নিকগুলো সরিয়ে ধ্বংস করার এ প্রক্রিয়ায় একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় কর্তৃপক্ষ, রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশন (বিএনএসিডব্লিউসি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিজিবি, বিসিএসআইআর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার ব্যাটালিয়ন এ কাজে সহযোগিতা করছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডে এসব রাসায়নিক নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে কাস্টমস।

নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি, তবে বাকি পণ্যের কী হবে

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে পুরোনো কনটেইনারের ভেতরে রাসায়নিক থাকলে আগুন, বিস্ফোরণ, বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়া কিংবা পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বন্দরে পড়ে থাকা অন্য মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিপজ্জনক রাসায়নিকগুলোর ক্ষেত্রেও একইভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এর আগে কাস্টমসকে দ্রুত নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম শেষ করার তাগিদ দিয়েছিল। কারণ, নির্ধারিত সময়ে এসব পণ্য নিষ্পত্তি না হলে বন্দরের ইয়ার্ড ও শেডে নিলামযোগ্য পণ্যের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ঝুঁকিও দীর্ঘায়িত হয়।

ফলে ২৩ বছর পর শুরু হওয়া এই অপসারণ কার্যক্রম শুধু নয়টি কনটেইনার সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বন্দরে পড়ে থাকা সব বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য দ্রুত শনাক্ত করে পর্যায়ক্রমে নিরাপদে নিষ্পত্তি করা হবে কি না—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর