chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামের ১৫ কিলোমিটার রিং রোড শেষ হয়নি ১৫ বছরেও !

পাঁচ দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়েছে ২৮৮%, মেয়াদ গড়িয়েছে প্রায় ১৬ বছরে। চট্টগ্রাম নগরের যানজট কমানো, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা এবং উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছিল ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্প। ২০১১ সালে শুরু হওয়া ১৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক যুগ পরও প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ গড়িয়েছে প্রায় ১৬ বছরে।

পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৮৫৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। পাঁচ দফা সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৮৮ শতাংশ।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি ও পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৯২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে এত দীর্ঘ সময়েও পুরো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও বারবার ব্যয় বাড়ানোর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৫ কিলোমিটার সড়ক, সঙ্গে আরও অবকাঠামো

প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে চার লেনের ১৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার মূল সড়ক। এর সঙ্গে রয়েছে ফিডার রোড, ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জ, রাউন্ডঅ্যাবাউট, ওয়েভ ডিটেক্টেড ওয়াল এবং উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করার বিভিন্ন কাজ।

প্রকল্পটি শুধু সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভূমি অধিগ্রহণ, বাঁধ, ফ্লাইওভার, ফিডার রোডসহ নানা অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক কাজও এর আওতায় রয়েছে। ফলে মোট প্রকল্প ব্যয়কে শুধু সড়কের দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় বিবেচনা করলে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র পাওয়া যাবে না।

পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, শুরুতে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২৪ কোটি টাকা।

চার বছরের প্রকল্প, সময় লাগছে প্রায় ১৬ বছর

২০১১ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করে। অর্থায়নে রয়েছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি।

পরে একের পর এক সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। পাঁচ দফা সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে।

প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনও প্রশ্ন তুলেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন চলার পরও কেন বারবার প্রকল্প সংশোধন ও ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জাইকার মূল্যায়নেও সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়

চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প নিয়ে জাইকার ২০২৩ সালের এক্স-পোস্ট মূল্যায়নেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় উঠে এসেছে।

প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম নগরের যানজট কমানো এবং বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা। পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় নির্মিত টানেলের সঙ্গে সড়কটির সংযোগের মাধ্যমে ঢাকামুখী ও দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী যানবাহনকে নগরের অভ্যন্তরীণ সড়কের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা ছিল।

এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে নগরকে রক্ষা এবং উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করাও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। বাঁধের ভেতরের এলাকায় আবাসন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, পর্যটন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।

সুফল মিলছে, তবে পুরোপুরি নয়

প্রকল্পের বড় একটি অংশ শেষ হওয়ায় এর কিছু সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী সব সুবিধা এখনো পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি এর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়ার সময়ও পিছিয়েছে। এতে সরকারি অর্থের পাশাপাশি বৈদেশিক অর্থায়নের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ার বিষয়টি শুধু অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যায়। তাই কাজ শেষ করার পাশাপাশি কেন নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেল না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

‘শেষ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।

তবে প্রায় ১৬ বছর ধরে চলা প্রকল্পটির ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করে জনগণকে পূর্ণ সুফল দেওয়া। একই সঙ্গে বারবার প্রকল্প সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।

চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ অবকাঠামো নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় এক যুগ বেশি সময় ধরে নির্মাণাধীন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—১৫ কিলোমিটারের একটি সড়ক প্রকল্পের জন্য এত দীর্ঘ সময় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

ফরিদা/চখ

এই বিভাগের আরও খবর