chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

সার যাচ্ছে মিয়ানমারে, ফিরছে মাদক

বাংলাদেশে কৃষকের জন্য ভর্তুকি দেওয়া সার যাচ্ছে মিয়ানমারে। আর এর বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক—এমন অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায়। স্থলসীমান্তে নজরদারি বাড়ায় এখন চট্টগ্রামের উপকূলীয় পথও ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে পরপর দুই অভিযানে ১ হাজার ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

সর্বশেষ বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ৩০ হাজার কেজি সারের বাজারমূল্য প্রায় ২১ লাখ টাকা। এ সময় সার পাচারে ব্যবহৃত দুটি ট্রাকসহ দুজনকে আটক করা হয়। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।

এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, ১০ সেপ্টেম্বর একই ঘাটে মিয়ানমারে পাচারের সময় তিনটি ট্রাক থেকে ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছিল কোস্ট গার্ড। ওই চালানে ছিল ৩৫ হাজার কেজি সার, যার আনুমানিক মূল্য ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তখনও দুটি ট্রাকসহ দুজনকে আটক করা হয়।

অর্থাৎ, মাত্র দুই দফা অভিযানে বাঁশবাড়িয়া ঘাট থেকে জব্দ হয়েছে ৬৫ হাজার কেজি বা ১ হাজার ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সীমান্তে আড়াই লাখ কেজি সার জব্দ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। নবোদয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড মিলে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করেছে। এ ঘটনায় ১২৭ জনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে।

এর মধ্যে কোস্ট গার্ড জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে ৩ হাজার ২৫২ বস্তা বা ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ কেজি সার জব্দ করেছে। এসব অভিযানে ৮২ জনকে আটক করে নয়টি মামলা করা হয়েছে। বিজিবিও বিভিন্ন অভিযানে ৭৩ হাজার ৩০৮ কেজি সার জব্দ করেছে।

চোরাচালানের ধরনও বদলেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্থলপথে নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা জলপথকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। নৌকার মাঝি, সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা, কৃষক কিংবা ভাড়ায় নেওয়া শ্রমিকদের ব্যবহার করে সার উপকূল ও সীমান্ত পার করার অভিযোগ রয়েছে। টেকনাফ, উখিয়া, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়া ছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু ও ঘুমধুম এলাকাকে সম্ভাব্য রুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম উপকূলেও একের পর এক চালান

চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে মিয়ানমারে সার ও অন্যান্য পণ্য পাচারের প্রবণতা নিয়ে এর আগেও একাধিক অভিযান চালিয়েছে কোস্ট গার্ড। আগস্টের শেষ দিকে ভাটিয়ারী এলাকায় একটি কার্গো বোট থেকে ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। একই মাসে পতেঙ্গা এলাকায় দুটি কার্গো বোটে অভিযান চালিয়ে ২৮০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ১ হাজার বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়েছিল।

কুতুবদিয়া চ্যানেল থেকেও ৬০ বস্তা ইউরিয়া সার ও ২৫০ বস্তা সিমেন্ট জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব অভিযান বলছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলীয় জলপথ শুধু পণ্য পরিবহনের রুট নয়, চোরাচালানকারীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন মিয়ানমারে যাচ্ছে বাংলাদেশের সার?

চোরাচালানের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রণোদনা হিসেবে উঠে আসছে দুই দেশের বাজারমূল্যের বিশাল ব্যবধান। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক বস্তা ইউরিয়া মিয়ানমারে প্রায় ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। ফলে একটি চালান পাচার করেই বিপুল মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও বৈধ বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে সার, সিমেন্ট, ডিজেলসহ বিভিন্ন পণ্য পাচার হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

‘সার যাচ্ছে, ফিরছে মাদক’

চোরাচালানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—সার পাচারের সঙ্গে মাদক ও অস্ত্র পাচারের যোগসূত্রের অভিযোগ।বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে সার, সিমেন্ট ও অন্যান্য পণ্য পাঠানোর বিপরীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইয়াবা, আইসসহ মাদক দেশে আনার অভিযোগ রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সার দিয়ে ইয়াবা আনার কোনো নির্দিষ্ট চালান জব্দের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

তবে একই ভৌগোলিক অঞ্চলে সার ও মাদক—দুই ধরনের চোরাচালান সক্রিয় থাকার তথ্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকালই সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭।

ভর্তুকির সার কৃষকের বদলে পাচারকারীর হাতে?

সার পাচারের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—পাচারকারীরা সার পাচ্ছে কোথা থেকে?

সরকার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে ইউরিয়াসহ বিভিন্ন সারে ভর্তুকি দেয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ বেশি থাকার পরও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের কৃষকদের একাংশ প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ১ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন, বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন—অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৫০০ মেট্রিক টন বেশি।

কৃষকদের অভিযোগ, কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের কাছেও সার বিক্রি করা হচ্ছে। পরে এসব সার মজুত করে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সার সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায় ফাঁক রয়েছে, তা খুঁজে দেখা জরুরি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, চট্টগ্রামে কোনো ডিলার পয়েন্ট থেকে সার মিয়ানমারে পাচারের তথ্য তাঁদের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো তদারকিতে রাখা হয় বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

ধরা পড়ছে বাহক, মূল হোতারা আড়ালে

চোরাচালানবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার ও বহনকারী আটক হলেও এসব ঘটনায় মূল অর্থদাতা বা নেপথ্যের সংগঠকদের কতজন শনাক্ত হয়েছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক বা বহনকারী; মূল হোতারা অনেক ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফে সার পাচারের ঘটনায় হওয়া কয়েকটি মামলায় ডিলারদেরও আসামি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় শুধু চালান আটক বা বাহক গ্রেপ্তার নয়, সার কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, কার মাধ্যমে পরিবহন হয়েছে, কোন ঘাটে নামানো হয়েছে, কারা নৌযান সরবরাহ করেছে এবং মিয়ানমারে কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল—এসব তথ্য তদন্তে বের করা জরুরি।

নজরদারিতে চট্টগ্রাম উপকূল

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া থেকে কুতুবদিয়া, পতেঙ্গা থেকে টেকনাফ—সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট, চোরাচালানের রুট ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। একদিকে স্থলসীমান্তে সার পাচার, অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূল ধরে জলপথে চালান পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

সার পাচার ঠেকাতে তাই শুধু সীমান্তে নয়, সার ডিলার, পরিবহন, গুদাম, ঘাট, কার্গো বোট ও উপকূলীয় নৌযান—পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মাদক পাচারের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের অভিযোগ তদন্তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

কারণ কৃষকের জন্য ভর্তুকি দেওয়া একটি বস্তা সার যখন সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়, তখন ক্ষতি শুধু কৃষকের নয়—একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভর্তুকি, কৃষি উৎপাদন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়।

ফরিদ|চখ

এই বিভাগের আরও খবর