হাসি-আনন্দের সকাল, রাতে পাশাপাশি শায়িত দুই বন্ধু
গত ১১ সেপ্টেম্বর, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। সকালটা শুরু হয়েছিল ফুটবল আর বন্ধুদের হাসি-আনন্দে। সকাল ৯টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ জেটি ঘাটসংলগ্ন নাফ নদীর তীরে ফুটবল খেলতে নামে একদল শিশু-কিশোর। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দের সকালই পরিণত হয় কান্না আর শোকে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জোয়ার এলে তলিয়ে যায় নাফের তীর। তখন কিশোরদের কেউ কেউ সাঁতার জানায় নদীতে গোসল করতে নামে। তাদের সঙ্গে ছিল শাহপরীরদ্বীপ উত্তরপাড়া এলাকার মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ নিশান (১২) ও একই এলাকার কেফায়েত উল্লাহর ছেলে মো. আরজিন (১৪)।
নিশান সাঁতার জানত না। তাই নদীতে না নেমে হাতে থাকা ফুটবল নিয়ে জেটির সিঁড়িতে বসেছিল। বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ তার হাত থেকে বলটি পানিতে পড়ে যায়। বলটি তুলতে তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় পা পিছলে নদীতে পড়ে যায় নিশান।
নিশান যখন প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল, তখন বন্ধুকে বাঁচাতে নিজের জীবনের কথা না ভেবে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল আরজিন। একে-অপরকে জড়িয়ে ধরলে দুইজনই পানিতে তলিয়ে যায়। বন্ধুকে বাঁচানোর সেই প্রাণপণ চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেল না-ফেরার দেশে। আরজিনকে বাঁচাতে গিয়ে তলিয়ে গেল নিশানও।
এদিকে, দুই শিশুর নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। জেলেরা নৌকা নিয়ে নাফ নদীর বিভিন্ন অংশে তল্লাশি শুরু করেন। খবর পেয়ে কোস্টগার্ড সদস্যরাও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে নিয়ে নদীর বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানো হয়। উৎকণ্ঠায় নদীর পাড়ে অপেক্ষা করতে থাকেন স্বজন ও স্থানীয়রা। অবশেষে প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুপুর ২টার দিকে শাহপরীরদ্বীপ বিজিবি বিওপির সামনে নাফ নদীর অংশ থেকে দুই শিশুকে উদ্ধার করা হয়।
দুইজনকে উদ্ধার করে দ্রুত টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পরে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দুই শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ।
শুক্রবার রাত ৯টায় শাহপরীরদ্বীপ প্রাইমারি স্কুল মাঠে দুই বন্ধুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরপাড়া বড় মাদ্রাসাসংলগ্ন কবরস্থানে তাদের পাশাপাশি দাফন করা হয়। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা দুই বন্ধু জীবনের শেষ যাত্রাতেও রইল পাশাপাশি। যে দুই কিশোরের একসঙ্গে ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই দুই বন্ধু এখন পাশাপাশি শায়িত একই কবরস্থানে।
নিশানের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘খুব শখ করে ছেলের নাম রেখেছি মোহাম্মদ। সে আমার আদরের সন্তান। শাহাদাতের সহিত মৃত্যুবরণ করেছে। এই শোক সইবার নয়, তবু মেনে নিয়েছি।’
শাহপরীরদ্বীপের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ইসমাইল বলেন, ‘সকালে নাফ নদীতে গোসল করতে গিয়ে দুই শিশু নিখোঁজ হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা তাদের উদ্ধারে তল্লাশি শুরু করেন। একপর্যায়ে দুজনকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে আরজিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিশানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।’
তিনি স্থানীয়দের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা সন্তানদের যত্ন নিন, সতর্ক থাকুন। এমন দৃশ্য যেন আর ফিরে না আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় শাহপরীরদ্বীপজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দিনটি শাহপরীরদ্বীপবাসীর জন্য একটি কালো দিন।’
স্থানীয় বাসিন্দা জাকারিয়া আলফাজ বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই নিশান ও তার বন্ধু-প্রতিবেশী আরজিনের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। দুই পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনা ময়নাতদন্তে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম। এছাড়া দুই শিশুকে উদ্ধারে এলাকাবাসীও যথেষ্ট শ্রম ও সহযোগিতা করেছেন। হে আল্লাহ, তাদের পরিবার-পরিজনকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন।
নিশান শাহপরীরদ্বীপ বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করত আরজিন। নাফের জোয়ার সরে গেছে, থেমেছে উদ্ধার অভিযানও। কিন্তু উত্তরপাড়ার দুই পরিবারের চোখের পানি যেন থামার নয়। এখন নিশান ও আরজিনের পরিবারের কাছে হয়ে আছে এক নির্মম স্মৃতি। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তারা ছিল একসঙ্গে; আর শেষ ঠিকানাতেও পাশাপাশি শুয়ে রইল দুই বন্ধু।
মআ/চখ