chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

খুলশীর ‘স্ক্যামিং হাব’: ৬৩ বিদেশির পাসপোর্ট-ভিসা নেই কারও

দেড় মাসে ১৪ ফ্ল্যাটে গড়ে উঠেছিল অনলাইন প্রতারণার আস্তানা; মাঠকর্মীরা কারাগারে, নেপথ্যের হোতারা এখনো অধরা।

চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত খুলশী-জালালাবাদ আবাসিক এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট। বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক ভবন মনে হলেও ভেতরে চলছিল ভিন্ন কর্মকাণ্ড। দেড় মাস আগে একে একে ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে বসানো হয় কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সার্ভারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম। এরপর দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করে শুরু হয় প্রতারণার কার্যক্রম।

অবশেষে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বেরিয়ে আসে সেই আস্তানার চিত্র। আটক করা হয় ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা সবাই চক্রটির মাঠপর্যায়ের কর্মী। মূলহোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ জানান, বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারণা চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। চক্রটি চাকরির প্রলোভন, আকর্ষণীয় ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন কৌশলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।

এক ভবনের ১৪ ফ্ল্যাট, দেড় মাসের ‘অপারেশন’

পুলিশের তথ্যমতে, চক্রটি প্রায় দেড় মাস আগে খুলশীর ওই বহুতল ভবনের ১৪টি ইউনিট ভাড়া নেয়। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় এসব ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিটি ইউনিটকে কার্যত আলাদা কর্মস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম। একটি আবাসিক ভবনের এতগুলো ইউনিট একসঙ্গে ভাড়া নিয়ে কীভাবে এতদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালিত হলো, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

পুলিশ বলছে, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য দেশীয় ও বিদেশি সহযোগীদের সমন্বয়ে চক্রটি কাজ করছিল।

কারা গ্রেপ্তার?

গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে রয়েছে পাঁচজন চীনা, ৩৫ জন লাওসের, ২১ জন পাকিস্তানের, একজন নেপালের এবং একজন ভিয়েতনামের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন পুরুষ, ২০ জন নারী ও একজন শিশু রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের কারও কাছেই পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়া যায়নি। এসব গুরুত্বপূর্ণ নথি বাংলাদেশি একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।

১৭০ ডিভাইসের তথ্য

অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশি ব্রিফিং ও একাধিক প্রতিবেদনে মোট ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম রয়েছে।
এই ডিভাইসগুলোই তদন্তের অন্যতম বড় আলামত। কারণ এগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণে চক্রটির ব্যবহৃত ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, অর্থ লেনদেনের তথ্য, সম্ভাব্য ভুক্তভোগী, বিদেশি যোগাযোগ এবং বাংলাদেশি সহযোগীদের পরিচয় বেরিয়ে আসতে পারে।

কীভাবে চলত প্রতারণা?

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চক্রটি বিভিন্ন আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে সেখানে আকৃষ্ট করত। চাকরির বিজ্ঞাপন বা বিভিন্ন ধরনের সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হতো।
এছাড়া অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গেও চক্রটির সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের তথ্য হ্যাক করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

‘মাঠকর্মীরা’ ধরা পড়েছে, মূলহোতারা বাইরে

পুলিশের দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিককে চক্রটির মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মনে করছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের ‘মাঠপর্যায়ের কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অনলাইনে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট পরিচালনা কিংবা প্রতারণার বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁদের ওপর ছিল বলে ধারণা পুলিশের।

কিন্তু এই বিশাল কর্মী বাহিনীকে কে নিয়ন্ত্রণ করছিল? তাঁদের বেতন বা পারিশ্রমিক কে দিত? অর্থ কোথায় জমা হতো? কোন দেশে বা কার কাছে সেই অর্থ পাঠানো হতো? কে তাঁদের বাংলাদেশে এনেছে? কে ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা আরও কিছু দেশি-বিদেশি ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পাসপোর্ট-ভিসা কোথায়—বড় প্রশ্ন

৬৩ বিদেশির কারও কাছে পাসপোর্ট-ভিসা না থাকার বিষয়টি তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ বিদেশি নাগরিকদের বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান ও চলাচলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ একই ভবনে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক দীর্ঘদিন অবস্থান করলেও তাঁদের ভ্রমণ নথি পাওয়া যাচ্ছে না—এতে মানবপাচার, অবৈধভাবে বিদেশি নাগরিক প্রবেশ করানো, দালালচক্রের সম্পৃক্ততা কিংবা অন্য কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
পুলিশ ইতোমধ্যে বলছে, নথিগুলো দেশীয় একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে। সেই চক্র শনাক্ত করা গেলে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

কক্সবাজারের ঘটনার সঙ্গে কি যোগসূত্র?

চট্টগ্রামের ঘটনার কয়েক দিন আগেই কক্সবাজারে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে ছয় বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, প্রায় ৩০-৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।
ওই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন চীনের এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম—দুই জায়গাতেই বিদেশি নাগরিক, বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং অনলাইন প্রতারণা বা সাইবার অপরাধের অভিযোগ সামনে আসায় তদন্তে সম্ভাব্য যোগসূত্রটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে চট্টগ্রাম পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এটি আপাতত তদন্তের বিষয় হিসেবেই রয়েছে।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর