ঠিকাদার বদলায়, সময় বাড়ে, শেষ হয় না জোরারগঞ্জ-আবুরহাট সড়কের কাজ
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জোরারগঞ্জ–আবুরহাট সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি। একাধিকবার ঠিকাদার পরিবর্তন ও কাজের মেয়াদ বাড়ানোর পরও সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকেরা।
২০২২ সালে সড়কটির উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও বিগত ৫ বছরে সরকার পরিবর্তন, এমপি পরিবর্তন, ঠিকাদার পরিবর্তন সময় বর্ধিতকরণ প্রত্যক্ষ করেছে জনসাধারণ। কিন্তু সড়কের কাজ শেষ হয়নি।
তবে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল আমিন এমপি সড়কটি পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ কে ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের উন্নয়নকাজ ২০২২ সালে শুরু হয়। দুই পাশ প্রশস্তকরণ ও সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করার কথা থাকলেও শুরু থেকেই নানা জটিলতায় কাজ বারবার বন্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় একপর্যায়ে ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়।
এলজিইডির নথিতে দেখা যায়, জোরারগঞ্জ বাজার থেকে তেমুহনী হয়ে আবুরহাট জিসি সড়কের উন্নয়নকাজের জন্য RNYB Ltd. ও Jonaet Enterprise যৌথভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর দুটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে কাজটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে—‘Rehabilitation of Zorarganj Bazar R&H to Aburhat GC Road via Tamohoni (Zorarganj–Tamohoni–Aburhat Road) by BC from Ch. 1000–2900m’। প্রকল্পটি Cyclone Amphan & Flood Damage Rural Infrastructure Rehabilitation Project-এর আওতাভুক্ত।
নথি অনুযায়ী, এ কাজের চুক্তিমূল্য ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৪ টাকা ৬৮ পয়সা। চুক্তির কার্যকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৪০ দিন। চুক্তিপত্রে কাজ শুরুর তারিখ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং নির্ধারিত সমাপ্তির তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৫ উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। বারবার সময় বাড়িয়ে ১২ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান । সর্বশেষ বর্ধিত সময় শেষ হওয়ার পর পুনরায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মিরসরাই উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ইমাম হোসেন।
তিনি জানান, সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এদিকে, এর আগেও ঠিকাদার পরিবর্তন ও সময় বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে বারবার । ২০২৩ সালে বিটুমিনসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখে চলে যায় বলে এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে। পরে ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তীতে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলেও কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত, কাদা ও পানি জমে থাকায় যান চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। পশ্চিম গোপিনাথপুর অংশটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ওই অংশে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় বর্ষার কারনে কাজ আরও বিলম্বিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী মেহেদী হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির সংস্কার কাজ অসমাপ্ত রেখে জন দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। ৫ বছরেও শেষ হয়নি সড়কের উন্নয়ন কাজ। জোরারগঞ্জ–আবুরহাট সড়কটি জনবহুল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। মহাসড়ক থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে। বারবার ঠিকাদার বদল ও সময় বাড়ানো হলেও কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
তেমুহনী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জমির উদ্দিন বলেন, এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন ধরে কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাঁচ কিলোমিটারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়নকাজ শেষ করতে কেন বছরের পর বছর সময় লাগছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথম ঠিকাদার কাজ শেষ করতে না পারলে ব্যবস্থা নিতে এত সময় লাগার কারণ এবং পরবর্তী ঠিকাদারের কাজের অগ্রগতি তদারকিতে এলজিইডির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সমাজকর্মী মাসুকুল আলম সোহান বলেন, জোরারগঞ্জ, ইছাখালী, কাটাছড়া ও আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ এ সড়ক ব্যবহার করেন। মাননীয় সংসদ সদস্য নুরুল আমিন জন দুর্ভোগ চিন্তা করে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের দাবি, আর সময় বাড়ানোর আশ্বাস নয়, এবার কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করে সড়কের উন্নয়নকাজ শেষ করতে হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী সাফায়েত ফারুক চৌধুরী জানান, আমি মিরসরাই উপজেলায় যোগদানের আগেও সড়কটি টেন্ডার হয়েছিলো, পরি সময় বাড়ানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ সমাপ্ত না করায় কার্যাদেশ বাতিল হয়েছে । মানুষের দুর্ভোগ চিন্তা করে আমি রি-টেন্ডার করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করেছি। তারাও কাজটি উদ্বোধন করার পর ফেলে রেখেছে।
সর্বশেষ ঠিকাদার কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে। কাজ না করলে আমরা চুক্তি বাতিলের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আমরা চাই কাজটি সম্পন্ন হলে ঠিকাদার বড় ধরনের জরিমানা থেকে রেহাই পাবে, জনসাধারণ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।
তাসু/চখ