চট্টগ্রামে হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ
বৃষ্টির পরপরই চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম কয়েক দিনেই পাঁচ শতাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নতুন রোগী। এরই মধ্যে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে ঘিরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪০৩ জন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪২ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩৬১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ২ হাজার ২২৪ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৭৯ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে চট্টগ্রামে মারা গেছেন ছয়জন। তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্তের হার যে গতিতে বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
একদিনে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭৭ রোগী
জাতীয় পর্যায়েও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৫৭১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আরও নয়জন। একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।
জাতীয় পর্যায়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে চট্টগ্রামেও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আগস্টের পর সেপ্টেম্বরে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির আশঙ্কা
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ কয়েক মাস ধরেই ধীরে ধীরে বাড়ছিল। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা কয়েকশতে থাকলেও আগস্টে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা এখন এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর বিস্তারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়। শহরের বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন ও বিভিন্ন জলাবদ্ধ স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। ফলে শুধু মশা নিধনে ওষুধ ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম নগরীতে বাড়ছে ঝুঁকি
চট্টগ্রাম নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, নির্মাণাধীন ভবন, অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বর্ষার পানি জমে থাকার পাশাপাশি অনেক এলাকায় বাসাবাড়ির ছাদ ও আঙিনায় থাকা বিভিন্ন পাত্রেও পানি জমে থাকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরবাসী নিজের বাসাবাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান জোরদার করা জরুরি।
মশা মারার চেয়ে প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিং বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করা হলেও যদি লার্ভা ও ডিম ধ্বংস না করা হয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মশা তৈরি হতে পারে। তাই চট্টগ্রাম নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন এবং বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি অপসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালে বাড়ছে চাপ
চট্টগ্রামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন অনেকে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা জরুরি। কারণ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ফরিদা|চখ