জাহাজ আমদানির বয়সসীমা ১০ বছরে নামানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান
বাংলাদেশে আমদানিকৃত জাহাজের বয়সসীমা ২৫ বছর থেকে কমিয়ে ১০ বছরে নামানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন সামুদ্রিক খাতের সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের বর্তমান জাহাজ মালিকানা, উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের বাস্তবতা বিবেচনা না করে বয়সসীমা কঠোর করা হলে জাহাজ আমদানি কমে যেতে পারে। এতে দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজের সংখ্যা হ্রাস, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি জাহাজ মালিক তুলনামূলক পুরনো কিন্তু ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা জাহাজ কিনে ব্যবসা শুরু করেছেন। নতুন জাহাজের সঙ্গে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী ভালো অবস্থার জাহাজের দামে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে সরাসরি ১০ বছরের বয়সসীমা কার্যকর হলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জাহাজ ব্যবসায় প্রবেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, কম বয়সী ও বেশি মূল্যের জাহাজ আমদানির ফলে প্রতিটি জাহাজ থেকে বেশি শুল্ক-কর আদায় হতে পারে—এমন ধারণা থাকলেও আমদানির সংখ্যা কমে গেলে সরকারের মোট রাজস্ব উল্টো কমতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় জাহাজের সংখ্যা কমলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। এতে পণ্য পরিবহন বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজের সঙ্গে শুধু জাহাজ মালিক নয়, জাহাজের অধিনায়ক, কর্মকর্তা ও নাবিক, নাবিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, জাহাজ প্রতিনিধি, বন্দরসেবা, জাহাজ মেরামত ও ডকিং, সামুদ্রিক সরবরাহ, বীমা, ব্যাংকিং, আইনি সেবা, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসহ বহু খাত যুক্ত থাকে। ফলে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা কমলে এসব খাতেও কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সামুদ্রিক খাতের অভিজ্ঞদের মতে, শুধু বয়স দিয়ে একটি জাহাজের নিরাপত্তা ও সমুদ্রযাত্রার উপযোগিতা নির্ধারণ করা উচিত নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস সংস্থার মানদণ্ড, বৈধ সনদ, জাহাজের কাঠামো ও যন্ত্রপাতির অবস্থা, জরিপের ইতিহাস, বন্দর রাষ্ট্রের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তারা ২৫ বছর থেকে সরাসরি ১০ বছরে না নামিয়ে ধাপে ধাপে বয়সসীমা কমানো, ভালো শ্রেণিবিন্যাস ও নিরাপত্তা রেকর্ড থাকা ২০–২৫ বছর বয়সী জাহাজের জন্য বিশেষ অনুমোদন এবং অন্তত ১০–১৫ বছরের রূপান্তরকাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
এ ছাড়া অভিজ্ঞ জাহাজ অধিনায়ক, জাহাজ মালিক, নৌ-স্থপতি, সামুদ্রিক প্রকৌশলী, জরিপ ও শ্রেণিবিন্যাস বিশেষজ্ঞ, সামুদ্রিক আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ ও সামুদ্রিক অর্থায়ন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন পেশাদার পরামর্শক কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নতুন জাহাজ আমদানি নয়; বরং বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি, দেশীয় নাবিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামুদ্রিক শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ধরে রাখা। তাই ১০ বছরের বয়সসীমা কার্যকরের আগে স্বাধীন মূল্যায়ন ও অংশীজনদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ফরিদা|চখ