chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

রাজস্ব আদায় ও পানি উৎপাদনে চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন রেকর্ড

রাজস্ব আদায় ও পানি উৎপাদন, দুই ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। দীর্ঘদিন ধরে মাসিক ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে আটকে থাকা রাজস্ব আদায় গত মাসে এক লাফে ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকায় উঠেছে। এক মাসের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা। একই সময়ে দৈনিক পানি উৎপাদনও বেড়ে গড়ে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ লিটারে পৌঁছেছে, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে দাবি করেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, বছরের পর বছর ওয়াসার রাজস্ব আদায় প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। কোনো মাসে ১৮ কোটি, কোনো মাসে ১৯ কোটি আবার কোনো মাসে ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব আদায় হতো। তবে গত মাসে সেই চিত্র বদলে গেছে। ওয়াসার ইতিহাসে এবার সর্বোচ্চ ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি পানি উৎপাদনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি মাস থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন হচ্ছে। এর আগে দৈনিক উৎপাদন ৪৬ থেকে ৪৮ কোটি লিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

ওয়াসা সূত্র জানায়, দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদন এমডির নজরে আসে। এরপর তিনি রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কম আদায়ের কারণ জানতে চান এবং আদায় কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।

ওয়াসার রাজস্ব ও প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের পানির বিলের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আদায়কে সাধারণত মাসিক লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধরা হয়। এত দিন মাসিক রাজস্ব আদায় ১৫ থেকে ১৯ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক উদ্যোগে আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২৫৯ কোটি টাকা বকেয়া

রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড হলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ এখনও প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কাছে বকেয়া ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পাওনা রয়েছে ১৮৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

বিপুল এই বকেয়া আদায়ে এরই মধ্যে আটটি মনিটরিং টিম মাঠে নামিয়েছে ওয়াসা। রাজস্ব ও প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত এসব টিমে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজস্ব কর্মকর্তা, রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক ও মিটার পরিদর্শকরা। টিমগুলোর কার্যক্রম তদারকি করছেন ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ)।

ওয়াসা সূত্র জানায়, গত ১৬ আগস্ট থেকে প্রতিটি কর্মদিবসে বকেয়াধারী গ্রাহকদের বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিল আদায়ের চেষ্টা করছেন এসব টিম। ৫০ হাজার টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে এমন গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা করে বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানানো হচ্ছে। কেউ বকেয়া পরিশোধে অস্বীকৃতি জানালে বিধি অনুযায়ী সংযোগ সাময়িক বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি অবৈধ পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ওয়াসার অনুমতি ছাড়া নেওয়া পানির সংযোগের কারণে সিস্টেম লস বাড়ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এসব অবৈধ সংযোগ জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে বৈধ গ্রাহক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত ১৬ আগস্ট নগরীর বিমানবন্দর সড়কের বন্দরটিলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. জসিম উদ্দিন নামে এক গ্রাহকের তিনটি পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ওয়াসার দাবি, ওই গ্রাহকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পানি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তিনটি সংযোগের বিপরীতে তার কাছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।

লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপেও নজর

বকেয়া রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছে ওয়াসা। অনুমতি ছাড়া স্থাপন করা গভীর নলকূপ বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করে লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে একদিকে সংস্থার রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও নিয়ন্ত্রণে আসবে।

বকেয়া রাজস্ব আদায়ে জনসচেতনতা তৈরিতেও কর্মসূচি নিয়েছে ওয়াসা। গত জুলাই থেকে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। নিয়মিত বিল পরিশোধে গ্রাহকদের উদ্বুদ্ধ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৮৬ হাজারের বেশি পানির সংযোগ

চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানায়, বর্তমানে সংস্থাটির মোট পানির সংযোগ রয়েছে ৮৬ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ ৭ হাজার ৭৬৭টি। নগরীর প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব গ্রাহকের কাছে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য ১৮ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের একই পরিমাণ পানির জন্য ৩৭ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসা বকেয়া রাজস্ব আদায়ে বদ্ধপরিকর। এ জন্য ডিএমডি (অর্থ)-এর তদারকিতে আটটি মনিটরিং টিম মাঠে জোরালোভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, বকেয়া বিল সরকারের রাজস্ব হওয়ায় তা মওকুফের সুযোগ নেই। সব বকেয়াধারী গ্রাহককে বিল পরিশোধ করে ওয়াসার সেবা উন্নয়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

অবৈধ সংযোগ ও লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপ স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অবৈধ সংযোগ বৈধ করা এবং গভীর নলকূপের লাইসেন্স নিতে হবে।

রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রেকর্ড পরিমাণ আদায় এবং পানি উৎপাদনে নতুন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। তবে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণে চলমান অভিযান কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর