লালদিয়া টার্মিনাল : চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন যুগের সূচনা
লালদিয়া টার্মিনালে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং—বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের বাণিজ্যপথ
চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে পতেঙ্গার লালদিয়া চরে দেশের সমুদ্রবন্দর অবকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগিয়ে শুরু হয়েছে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ।
রোববার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১টায় আনুষ্ঠানিক গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে এ মেগা প্রকল্পের নির্মাণযাত্রা শুরু হয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রকল্পকে শুধু একটি নতুন কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, এটি চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের আরও শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করবে। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, লালদিয়া টার্মিনাল বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর প্রবেশদ্বারে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে বিনিয়োগ হচ্ছে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় ধরা হয়েছে তিন বছর।
প্রকল্পটির পুরো অবকাঠামো গড়ে উঠবে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গার ওপর। এর মধ্যে ৩২ একর জায়গায় থাকবে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর জায়গায় থাকবে ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা।
টার্মিনালটির জেটি হবে প্রায় ৬১৬ মিটার দীর্ঘ। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অর্থাৎ নতুন এই টার্মিনাল একদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর চাপ কমাতে পারে, অন্যদিকে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে নতুন সক্ষমতা যোগ করবে।
বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ
লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হবে বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা। নির্মাণ শেষে এখানে প্রায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফট এবং ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ব বাণিজ্যে কনটেইনার পরিবহনের আকার ক্রমেই বড় হচ্ছে। ফলে বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে পারা মানে শুধু বেশি পণ্য পরিবহন নয়—প্রতি ইউনিট পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার সুযোগও তৈরি হওয়া।
বিদেশি বিনিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম
লালদিয়া প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রথম টার্মিনাল হিসেবে সামনে এসেছে। ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণ শেষে ২০৩০ সাল থেকে ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ বছর পর্যন্ত পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানেই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদেশি অপারেটরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটি পরিচালিত হলে বাংলাদেশ কীভাবে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করবে?
কারণ, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ে না। টার্মিনালের অপারেশন, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্য খালাস, সড়ক-রেল যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ‘চাপ’ কমানোর নতুন পথ
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানে লালদিয়া চর থেকে গুপ্তবাঁক পার হলেই রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। আরও কয়েক কিলোমিটার উজানে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল ও জেনারেল কার্গো বার্থ।
অর্থাৎ লালদিয়া টার্মিনালকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলীর তীরবর্তী এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার-হ্যান্ডলিং করিডোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি একই অঞ্চলে একাধিক টার্মিনালের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।
সময় ও খরচ কমানোর প্রত্যাশা
লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং বন্দরের লজিস্টিকস ব্যয় কমিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্রুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ এর সুফল শুধু বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজ কোম্পানি বা টার্মিনাল অপারেটরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পরিবহন ব্যবসা, শিল্পকারখানা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
একটি কনটেইনার বন্দরে দীর্ঘসময় আটকে থাকলে বাড়ে জাহাজের অপেক্ষা, স্টোরেজ, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়। সেই সময় কমানো গেলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির সঙ্গে বন্দরের যোগসূত্র
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী লালদিয়া টার্মিনালকে দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে আধুনিক বন্দর, উন্নত লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের বাণিজ্যিক অবকাঠামো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বন্দর ও বাণিজ্য খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ বন্দরের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
এই বক্তব্যের মধ্যেই লালদিয়া প্রকল্পের মূল গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভরভাবে আরও বড় হতে চায়, তাহলে সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
২০২১ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ প্রস্তুতির পর মাঠে কাজ
লালদিয়া টার্মিনালের গল্প আজকের গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের পরিকল্পনা ও আলোচনা।
২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর ২০২৩ সালে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়।
একই বছরের নভেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের বৈঠকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত আরও এগিয়ে যায়।
অবশেষে ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট এসে প্রকল্পটি কাগজ থেকে দৃশ্যমান নির্মাণ পর্যায়ে প্রবেশ করল।
সম্ভাবনার পাশাপাশি নজর দিতে হবে যেসব বিষয়ে লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে সম্ভাবনা যত বড়, প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
প্রথমত, নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করা যাবে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, টার্মিনাল চালুর পর সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যায়, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ আধুনিক টার্মিনাল থাকলেও যদি কনটেইনার দ্রুত দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পুরো সুফল পাওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, রাজস্ব সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখা জরুরি।
‘বন্দর’ থেকে ‘লজিস্টিকস হাব’
লালদিয়া টার্মিনাল নিয়ে সরকারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন সম্ভবত এখানেই—চট্টগ্রামকে কেবল বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি লজিস্টিকস হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর প্রবেশদ্বারে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের অবস্থান, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি বাজার এবং দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। লালদিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগানোর নতুন অবকাঠামোগত ভিত্তি হতে পারে।
ফরিদা|তাসু|চখ