chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

লবণাক্ত পানিতে উপকূলের নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি

সুপেয় পানির সংকট উপকূলীয় নারীদের জীবনে শুধু দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে তাদের মাসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন নিরাপত্তায়। নিরাপদ মিঠাপানি না পেয়ে অনেক নারী লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক চাপ।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির লবণাক্ততা তীব্র আকার ধারণ করে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত লবণাক্ততা সাধারণত সর্বোচ্চ থাকে। বর্ষায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক এলাকায় সারা বছরই নিরাপদ পানির সংকট থাকে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাব এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকার অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে রয়েছে। কোথাও কোথাও ৫০০ থেকে ৭৫০ ফুট গভীর নলকূপের পানিতেও লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে।

মাসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব

পানির সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায় মাসিকের সময়ে। অনেক নারী ও কিশোরী মাসিক ব্যবস্থাপনায় কাপড় ব্যবহার করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মিঠাপানি না থাকায় তা লবণাক্ত পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। এতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ও লবণাক্ত পানির সম্পর্ক উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাদের ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ মাসিকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ত্বকে জ্বালাপোড়ার কথাও জানিয়েছেন।

গবেষণায় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শের সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও গবেষকরা সব ধরনের প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে লবণাক্ততাকে দেখাননি। বরং নিরাপদ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার মিলেই ঝুঁকি বাড়ায়।

মাসিক পিছাতে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি

পানির সংকটের কারণে মাসিক ব্যবস্থাপনায় নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। ইউএনডিপি ও ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু তরুণী পর্যাপ্ত পানি ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকায় মাসিক পিছিয়ে দিতে বা বন্ধ রাখতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার নিরাপদ নয়। মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভরতা নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় বাড়ছে উদ্বেগ

উপকূলের লবণাক্ত পানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে গর্ভবতী নারীদের ওপর। বাংলাদেশের দাকোপ এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় পানিতে সোডিয়ামের মাত্রা এবং গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এক গবেষণায় দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে পানীয় পানির মাধ্যমে নারীদের শরীরে সোডিয়াম গ্রহণ বর্ষাকালের তুলনায় বেশি। একই এলাকায় গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের হাসপাতালভিত্তিক হার শুষ্ক মৌসুমে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে বর্ষাকালে ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

আরেক গবেষণায় ৩০০ মিলিগ্রাম/লিটারের কম সোডিয়ামযুক্ত পানির তুলনায় ৯০০ মিলিগ্রাম/লিটারের বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারীদের গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার সম্মিলিত ঝুঁকি প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি পাওয়া যায়।

পানি সংগ্রহেও বাড়ছে শারীরিক চাপ

নিরাপদ পানি না থাকায় উপকূলের নারীদের অনেক দূর হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়। মাথায় বা হাতে ভারী পাত্র বহন করে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় তাদের।

ইউএনডিপির সঙ্গে কথা বলা নারীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ভারী পানির পাত্র বহনের কারণে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি জরায়ু নেমে যাওয়ার সমস্যার কথাও কেউ কেউ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অনেক নারী সহজে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারেন না। ব্র্যাকের প্রতিবেদনে এমন উপকূলীয় এলাকার কথা উঠে এসেছে, যেখানে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করতে হয়। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা হলেও অনেকে সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না।

সমাধান নিরাপদ পানিতে

উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শুধু চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ মিঠাপানি নিশ্চিত করা, নারী ও কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ স্যানিটেশন এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর প্রভাব তাই শুধু কৃষি, জীবিকা কিংবা পরিবেশে সীমাবদ্ধ নেই; ধীরে ধীরে তা পৌঁছে যাচ্ছে নারীর শরীর ও প্রজনন স্বাস্থ্যে। ফলে উপকূলের পানি সংকটকে এখন পরিবেশগত সমস্যার পাশাপাশি নারীর স্বাস্থ্য ও অধিকারসংক্রান্ত জরুরি বিষয় হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর