chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

বছরে ১৫ হাজারের বেশি আত্মহত্যা, আত্মহত্যার মিছিলে চট্টগ্রামও

চট্টগ্রাম নগরীতে নিজ বাসায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনা আবারও সামনে এনেছে আত্মহত্যার ভয়াবহ বাস্তবতা। পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক অশান্তির জেরে তিনি নিজেই মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন। ব্যবহৃত অস্ত্রটি অবৈধ বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এর মধ্য দিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে আইনি শাস্তির আওতায় আনার যৌক্তিকতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে

বাংলাদেশে আত্মহত্যার চিত্র যে কতটা উদ্বেগজনক, সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যেই তার প্রমাণ মিলছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ৭৬ হাজার ৩৬১টি আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশে নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারের বেশি এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪২ জন আত্মহত্যায় মারা গেছেন।

রোববার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর আইসিডিডিআরবিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক এক সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে সভাটির আয়োজন করে।

সভায় উপস্থাপিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০’-এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয় ২০২২ সালে—১৬ হাজার ৮৮৬টি। আর সবচেয়ে কম ছিল ২০২৪ সালে—১৩ হাজার ৯৭৫টি।

সবচেয়ে বেশি যশোরে

জেলাভিত্তিক হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার মামলা নথিভুক্ত হয়েছে যশোরে—১ হাজার ৪৫৪টি। এরপর বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়া জেলার তালিকায় রয়েছে ঢাকা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, ঝিনাইদহ ও নওগাঁ।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের নথিতে থাকা সংখ্যা প্রকৃত চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে না। কারণ আত্মহত্যার ঘটনায় সামাজিক কলঙ্ক, পরিবারের সম্মানহানির আশঙ্কা, আইনি ঝামেলার ভয় এবং নানা সামাজিক কারণে অনেক পরিবার প্রকৃত ঘটনা গোপন করতে পারে। আবার কোনো কোনো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়েও অস্পষ্টতা থাকে।

ফলে দেশে আত্মহত্যার প্রকৃত সংখ্যা পুলিশের পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রামের ব্যাংকারের মৃত্যু যে প্রশ্ন তুলছে

চট্টগ্রাম নগরীতে সম্প্রতি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও সামনে এনেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন। অস্ত্রটি বৈধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘটনা একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—একদিকে তীব্র মানসিক ও পারিবারিক সংকট, অন্যদিকে একজন বিপর্যস্ত মানুষের হাতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের উপস্থিতি।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত সাধারণত একক কোনো কারণে তৈরি হয় না। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক চাপ, চাকরি হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপসহ একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি হঠাৎ করে তীব্র সংকটে পড়েন এবং একই সময়ে প্রাণঘাতী উপকরণ হাতে পান, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

তরুণদের ঝুঁকি বেশি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক তথ্যেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আত্মহত্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তরুণদের মধ্যে পারিবারিক ও সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপ, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু মানসিক সংকটে থাকা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং ও চিকিৎসাসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেকেই সংকটের সময়ে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার আগেই চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

আত্মহত্যার চেষ্টা কি অপরাধ হওয়া উচিত?

আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশের আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এসেছে।
বর্তমান দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা করা এবং সে উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

অন্যদিকে কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক সভায় অধিকাংশ মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ৩০৯ ধারা বাতিল অথবা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।

তাঁদের যুক্তি, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তি সাধারণত এমন এক গভীর মানসিক বা সামাজিক সংকটের মধ্যে থাকেন, যেখানে শাস্তির পরিবর্তে তাঁর প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তা। আইনি শাস্তির ভয় থাকলে তিনি কিংবা তাঁর পরিবার ভবিষ্যতে এমন ঘটনা গোপন করতে পারেন। এতে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ আরও কমে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিমও আইনটি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

প্রাণঘাতী উপকরণে প্রবেশাধিকার কমানো জরুরি

আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রাণঘাতী উপকরণে সহজ প্রবেশাধিকার কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সভায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশকের বিক্রি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার আরও নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে যেসব ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে, সেখানেও বৈধতা, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির নাগালের বাইরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রামের ব্যাংকারের মৃত্যুর ঘটনায় যদি অস্ত্রটি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আত্মহত্যার পাশাপাশি নগরীতে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের হাতে সহজে প্রাণঘাতী অস্ত্র পৌঁছে গেলে সংকট মুহূর্তের একটি সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই অপূরণীয় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

তথ্যই হতে পারে প্রতিরোধের প্রথম ধাপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। বর্তমানে পুলিশ, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য আলাদা আলাদাভাবে থাকার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ কঠিন।
এ কারণে হাসপাতাল, থানা ও স্থানীয় পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি সমন্বিত ডেটাবেজ থাকলে কোন বয়সে, কোন এলাকায়, কোন সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি—তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং, সচেতনতা এবং সামাজিক সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে।

চট্টগ্রামেও দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বড় নগরী ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। নগরজীবনের ব্যস্ততা, চাকরি ও ব্যবসার চাপ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদা করে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

একজন ব্যাংকারের আত্মহত্যা কিংবা একজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা—দুটিই একই বার্তা দেয়: সংকটে থাকা মানুষকে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা দুর্বল।

পরিবারের সদস্য, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, চরম হতাশা বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখালে বিষয়টিকে অবহেলা না করে সহায়তার হাত বাড়ানো জরুরি।

আত্মহত্যার চিন্তা কোনো ‘অপরাধ’ নয়; এটি অনেক সময় গভীর সংকটের সংকেত। তাই এমন পরিস্থিতিতে শাস্তির ভয় নয়, প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, সহমর্মিতা, দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সহায়তা।
বাংলাদেশে বছরে ১৫ হাজারের বেশি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হওয়া নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একগুচ্ছ সম্পর্ক এবং অপূরণীয় ক্ষতি।

চট্টগ্রামের ব্যাংকারের গুলিবিদ্ধ মৃত্যু সেই সংখ্যার আরেকটি দুঃখজনক সংযোজন। এখন প্রশ্ন—আর কত মৃত্যু হলে আত্মহত্যা প্রতিরোধকে কেবল আলোচনার বিষয় না রেখে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে?

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর