chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

সীতাকুণ্ডে মৃত্যুফাঁদ

শ্রমিক নিরাপত্তা বন্দি কাগজে-কলমেই

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পে ৪০০-এর বেশি শ্রমিক নিহত এবং ৬ হাজারের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন। আর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইপসার হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত ১৩ বছরে মৃত্যু হয়েছে ১৬১ জনের।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই বিলিয়ন ডলারের শিল্পের আড়ালে যে শ্রমিকদের লাশের পাহাড় জমছে, তার সর্বশেষ প্রমাণ শুক্রবারের (১৪ আগস্ট) ট্র্যাজেডি।

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ‘ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে’ একটি বাতিল জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে ৯ জন শ্রমিক মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন। জাহাজের ভেতরে আটকে পড়া শ্রমিকদের বাঁচাতে গিয়ে আরও ১০-১৫ জন অসুস্থ হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, যা বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, সীতাকুণ্ডে তা কার্যত এক মৃত্যুফাঁদ।

মহামারির চেয়েও ভয়ংকর যে পরিসংখ্যান

শুক্রবারের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত অবহেলার একটি দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর ইতিহাসের অংশ মাত্র।

মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব: মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পে ৪০০-এর বেশি শ্রমিক নিহত এবং ৬ হাজারের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন। আর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইপসার হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত ১৩ বছরে মৃত্যু হয়েছে ১৬১ জনের।

আয়ুষ্কাল হ্রাস: মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ তথ্য দিচ্ছে—এই শিল্পে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকদের গড় আয়ু দেশের জাতীয় গড় আয়ুর চেয়ে প্রায় ২০ বছর কম। সংস্থাটির মতে, ২০২০ সাল থেকে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ৫২০টির বেশি জাহাজ ভাঙার কাজ করেছেন।

আহত শ্যমিক.jpgসীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস বের হচ্ছে জানতে পেরে ভেতরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ১০-১৫ শ্রমিক। তাদের চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় বিভিন্ন হাসপাতালে। ছবি: সংগৃহীত

কী থাকে এসব ভাসমান বোমায়?

মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, প্রতিটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ওজন ৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন পর্যন্ত হতে পারে (গড় ওজন ১৩ হাজার টন)। একেকটি জাহাজ কাটলে বেরিয়ে আসে ১০ থেকে ১০০ টন পর্যন্ত বিষাক্ত পেইন্ট। তেলবাহী ট্যাংকারে প্রায় এক হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত অবশিষ্ট তেল, হাইড্রোলিক তেল ও লুব্রিকেন্ট থাকে।

২০২৪ সালে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জার্নাল ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, একটি পুরোনো জাহাজ ভাঙলে বের হয় মারাত্মক রাসায়নিক ও ভারী ধাতু। সেগুলো হচ্ছে—পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি), ট্রিবিউটাইলটিন (টিবিটি), ওজোনস্তর ক্ষয়কারী পদার্থ (ওডিএস), ডাইঅক্সিন, পিভিসি, পিএএইচ, পারদ, সীসা, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম।

অ্যাসবেসটস: পুরোনো জাহাজে থাকা এই পদার্থটির সূক্ষ্ম তন্তু শ্বাসের সঙ্গে ঢুকলে ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাসবেসটোসিস ও মেসোথেলিওমার মতো প্রাণঘাতী রোগ হয়।

গ্যাস ও ধোঁয়া: গ্যাস কাটিংয়ের সময় ফ্রেয়ন, এলপিজি, অ্যামোনিয়া ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস এবং বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয়, যা বদ্ধ জায়গায় জমে অগ্নিকাণ্ড বা শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক ডকুমেন্টারিতেও উঠে এসেছে, এই ইয়ার্ডগুলোর আশপাশে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

শ্রমিকদের ফুসফুসের চিত্র: একটি নীরব মৃত্যু

২০১৯ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের ১২০ জন পুরুষ শ্রমিকের ওপর পালমোনারি ফাংশন টেস্ট (স্পাইরোমেট্রি) করে এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।

অংশগ্রহণকারীদের ৭১% পাঁচ বছরের কম সময় ধরে কাজ করছিলেন এবং ৯৫.৮% এর আগে কখনো শ্বাসতন্ত্রের কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু কাজ শুরুর পর ৮৫% কর্মস্থলে ঠান্ডা বা হাঁচির সমস্যায় ভোগেন এবং ৮০% জানান ছুটির দিনে তারা তুলনামূলক ভালো অনুভব করেন।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৭৯% শ্রমিকের ফুসফুস স্বাভাবিক নেই। এর মধ্যে ৫৮.৩৩% দ্রুত বাতাস বের করতে পারেন না এবং ২০.৮৩% এর ফুসফুসের ধারণক্ষমতা একেবারেই কমে গেছে।

সুরক্ষা সরঞ্জাম: গ্লাভসের বদলে মোজা!

২০২৩ সালে প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের ৯০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্রও দেওয়া হয় না। পর্যাপ্ত পিপিই না থাকায় গরম ধাতু কাটার সময় শ্রমিকরা সাধারণ মোজাকে গ্লাভস হিসেবে ব্যবহার করেন। বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে বাঁচতে নাক-মুখ ঢাকেন নিজেদের জামা দিয়ে, আর ভারী লোহার টুকরো বহন করেন খালি পায়ে।

গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে এই খাতের ঝুঁকিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়—তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী ঝুঁকি; আগুন, গ্যাস বিস্ফোরণ, শ্বাসরোধ এবং ওপর থেকে লোহার প্লেট পড়ে মৃত্যু (যেমনটি ঘটেছিল ২০০০ সালের ৩১ মে, ইরানি ট্যাংকার ‘টিটি দেনা’ বিস্ফোরণে, যেখানে ৫০ জন নিহত হন)। কর্মস্থলজনিত ঝুঁকি; ধোঁয়া ও রাসায়নিকের প্রভাবে ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া; অ্যাসবেসটস ও ভারী ধাতুর কারণে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগ।

জাহাজ ভাঙা (1).jpegআইন আছে, প্রয়োগ নেই: হাস্যকর ক্ষতিপূরণ ও নজরদারির অভাব

বাংলাদেশে ‘শ্রম আইন ২০০৬’, ‘জাহাজভাঙা ও রিসাইক্লিং বিধিমালা ২০১১’, ‘রিসাইক্লিং আইন ২০১৮’ এবং ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে বাসেল ও হংকং কনভেনশন।

২০২৩ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে হংকং কনভেনশন (বিপজ্জনক পদার্থ ব্যবস্থাপনা, জরুরি প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দুর্ঘটনা রেকর্ড করা) মেনে চলতে সম্মত হয়। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ শূন্য।

মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউট বলছে, শ্রম আইনে মৃত্যুর জন্য মাত্র ২ লাখ এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে, যা জীবনের মূল্যের কাছে নিছক উপহাস।

সবচেয়ে বড় প্রহসন হচ্ছে তদারকির দায়িত্বে থাকা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ভূমিকা। সংস্থাটির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেছেন, শ্রম আইনের আলোকে আমরা নিরাপত্তা দেখি। কিন্তু বিষাক্ত রাসায়নিক ও গ্যাসের ঝুঁকি অত্যন্ত গভীর ও কারিগরি দক্ষতার বিষয়, যা সাধারণত আমাদের আওতায় পড়ে না।

তিনি উল্টো অনভিজ্ঞ শ্রমিকদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে বলেন, নতুন শ্রমিকদের ঝুঁকি বোঝানো কঠিন। তার মতে, কাজের পদ্ধতি রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়, সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যাদের কাজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের মুখেই কারিগরি দক্ষতার অভাবের এমন অসহায় স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, এই শিল্পে শ্রমিকদের জীবন কতটা সস্তা এবং নিরাপত্তাহীন।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর