ভরা মৌসুমেও চট্টগ্রামে ইলিশের আকাল
সাগরে কমছে জেলেদের জালভরা মাছ, বাজারে বাড়ছে দাম—সরবরাহ সংকটের আড়ালে কি মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি?
বর্ষা মানেই ইলিশের মৌসুম। বঙ্গোপসাগর, নদী ও মোহনায় এ সময় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ওঠার কথা। চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট, আনন্দবাজার, রাসমনি ঘাট, কাট্টলীসহ উপকূলীয় মাছের ঘাটগুলোতে থাকার কথা উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ভরা মৌসুমেও চট্টগ্রামের বাজারে ইলিশের সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কোথাও মাছ মিলছে কম, কোথাও আবার মাছ থাকলেও দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে ‘মাছের রাজা’ ইলিশ ক্রমেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিলাসী পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সন্দ্বীপ চ্যানেল এলাকায় ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলেরা। তাদের কেউ কেউ এক বেলায় মাত্র কয়েক হাজার টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছেন; সেই আয় থেকে শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি খরচ মেটাতেই বড় অংশ চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের বাজারে গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে আরেক বাস্তবতা—সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও দাম কমছে না। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের উপকূলীয় ঘাট থেকে ফিশারিঘাট এবং খুচরা বাজার পর্যন্ত ইলিশের সরবরাহ বেড়েছিল, কিন্তু তখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে আছে অনেক মাছ।
সাগরে মাছ কম, বাজারে দাম বেশি
চট্টগ্রামের ইলিশের বড় একটি উৎস বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় জলসীমা। সাগরে জেলেদের জালে কতটা মাছ উঠছে, তার ওপর সরাসরি নির্ভর করে নগরীর বাজারে ইলিশের সরবরাহ। কিন্তু চলতি মৌসুমে সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন জেলেরা। এর প্রভাব প্রথমে পড়ে ঘাটে, এরপর পাইকারি আড়তে এবং সর্বশেষ খুচরা বাজারে।
চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট নগরের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক মাছের অবতরণকেন্দ্র। অতীতে ভরা মৌসুমে এখানে বিপুল পরিমাণ ইলিশের বেচাকেনা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক সময় সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। ২০২৩ সালের দিকে ভরা মৌসুমে ফিশারিঘাটে দৈনিক ইলিশের বেচাকেনা প্রায় ২ হাজার মণ থেকে নেমে প্রায় ২০০ মণ হতো। এবার সাগরে ইলিশ কম পাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সন্দ্বীপ চ্যানেলেও ‘ইলিশ-খরা’
জেলেরা জানিয়েছেন, সীতাকুণ্ডের কুমিরা উপকূল ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে প্রত্যাশিত ইলিশ উঠছে না। এক বেলায় একজন জেলের জালে মাত্র প্রায় ৩ হাজার টাকার ইলিশ উঠেছে। শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি তেলের খরচ মেটানোর পর হাতে কার্যত কিছুই থাকছে না।
জেলেরা বলছেন, একজন জেলে যখন পর্যাপ্ত মাছ পান না, তখন তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। নৌকার জ্বালানি, বরফ, খাবার, শ্রমিকের মজুরি, জাল মেরামত—সব খরচ আগের মতোই থাকে। কিন্তু মাছ কমে গেলে প্রতি কেজি মাছের ওপর সেই খরচের চাপ বেড়ে যায়। ফলে ঘাটে যে মাছ তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়, সেটিই কয়েক ধাপ হাতবদলের পর খুচরা বাজারে আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ইলিশের বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে স্থানীয়ভাবে ধরা সামুদ্রিক ইলিশের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা ইলিশও বাজারে ঢোকে। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, নোয়াখালী, হাতিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইলিশ চট্টগ্রামের বাজারে আসতে পারে। আবার চট্টগ্রাম থেকেও অন্য অঞ্চলের বাজারে ইলিশ যায়।
ঘাট থেকে খুচরা বাজার—দাম বাড়ে কত ধাপে?
সাগর থেকে মাছ ওঠার পর সেটি সাধারণত জেলে → আড়তদার → পাইকার → পরিবহনকারী/মোকাম → খুচরা বিক্রেতা—এমন একাধিক ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় পরিবহন, বরফ, শ্রমিক, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, কমিশন এবং ব্যবসায়িক মুনাফা।
ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, এসব ধাপ যত বাড়ে, চূড়ান্ত দামও তত বাড়ে।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ আরও গুরুতর—কিছু বাজারে একই ধরনের ইলিশের দাম প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় তারা বাজারে অদৃশ্য সমন্বয় বা সিন্ডিকেটের আশঙ্কা করছেন।
‘মাছ আছে, কিন্তু কেনার সাধ্য নেই’
চট্টগ্রামে ইলিশের বাজারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। ২০২৫ সালের এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে আকারভেদে ইলিশের দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। আবার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের উপকূল থেকে নগরের পাইকারি ও খুচরা বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছিল। কিন্তু দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি।
এবারও একই প্রশ্ন সামনে—ভরা মৌসুমে যদি ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে বছরের অন্য সময়ে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
একজন মধ্যবিত্ত ক্রেতার কাছে এক কেজি ইলিশ মানে এখন শুধু একটি মাছ কেনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিসাব।
ফলে অনেকেই বাজারে গিয়ে ইলিশের দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ ছোট মাছ কিনছেন, কেউ চাষের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
ফরিদা|চখ