চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সভা
ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠন শক্তিশালী করার নির্দেশ তারেক রহমানের
চট্টগ্রাম বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের মূল সংগঠনের সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই পরিবারের সদস্য হিসেবে নেতাকর্মীদের পরস্পরের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল রোববার রাত সোয়া ৮টার দিকে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার হোটেল রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউতে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় এসব নির্দেশনা দেন তারেক রহমান।
সরকার গঠনের পর চট্টগ্রামের নেতাদের সঙ্গে এটিই ছিল বিএনপির চেয়ারম্যানের প্রথম সাংগঠনিক বৈঠক। এ কারণে সভাটি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, সভায় মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় সাতশ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। দীর্ঘ এ সাংগঠনিক সভায় চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং দলের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
‘সবাইকে এক পরিবারের মতো থাকতে হবে’
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব ও বিভাজন না রেখে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলাদা কোনো শক্তি নয়। সবাইকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করতে হবে। দলের মূল সংগঠনের সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখতে হবে।
বিশেষ করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের বিএনপির মূল সংগঠনের সঙ্গে মিলেমিশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নির্দেশনা দেন তিনি।
সভায় উপস্থিত নেতারা জানান, তারেক রহমান নেতাদের কাছে জানতে চান, ‘এই সরকার কার সরকার?’
জবাবে কেউ বিএনপির সরকার আবার কেউ আন্দোলনের সরকার হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন দলের চেয়ারম্যান সবাইকে সরকারকে ‘আমার সরকার’ বা ‘আমাদের সরকার’ হিসেবে ভাবার আহ্বান জানান।
নেতারা বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে না রেখে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে সরকারের সফলতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নেতাকর্মীদের সচেতন থাকার কথাও বলেন তিনি।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে বিভেদ নয়
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও নেতাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
সভায় উপস্থিত নেতাদের ভাষ্য, নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ভেতরে কোনো ধরনের বিভাজন বা বিরোধ তৈরি না করার জন্য সতর্ক করেছেন তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
তারেক রহমান বলেছেন, একই পরিবারের সদস্য হিসেবে নির্বাচনের সময় সবাইকে একে অপরের পাশে থাকতে হবে। দলীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের শক্তি কাজে লাগিয়ে জনগণের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
একাধিক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার বার্তাই দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান।
গুজব থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ
সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়েও নেতাদের সতর্ক করেছেন তারেক রহমান।
নেতাদের তিনি পরামর্শ দেন, কোনো তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস বা প্রচার করা যাবে না। দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বিভ্রান্তিকর কোনো প্রচারণায় জড়িয়ে পড়া যাবে না।
সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে মন্তব্য না করার জন্য নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন।
সভায় উপস্থিত একজন নেতা বলেন, ‘গুজব ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের আরও সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন দলের চেয়ারম্যান। জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।’
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়েও আলোচনা
সাংগঠনিক বিষয় ছাড়াও দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তারেক রহমান।
নেতারা জানান, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, চুক্তি ও ব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে সভায় উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে করা বিভিন্ন চুক্তি ও বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা থেকে বের হয়ে আসতে সময় প্রয়োজন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের সজাগ ও দায়িত্বশীল থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তুলে ধরার আহ্বান
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। তৃণমূলের মানুষের সমস্যা শুনতে হবে। তাদের প্রত্যাশা ও সমস্যাগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যাতে ভুল ধারণা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেন তিনি।
প্রায় সাতশ নেতার অংশগ্রহণ
রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সাংগঠনিক সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্বও ছিল।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি সাংগঠনিক বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়। চট্টগ্রাম বিএনপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এ সভার নির্দেশনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
হোটেলের বাইরে নেতাকর্মীদের ভিড়
সাংগঠনিক সভাকে কেন্দ্র করে রেডিসন ব্লু হোটেলের বাইরেও বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।
হোটেলের প্রবেশপথ থেকে লালখান বাজার হয়ে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এ সময় তারা দলীয় স্লোগান দেন এবং দলের চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানান।
তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
দলীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি সাংগঠনিক বৈঠকে বসে তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তার মূল লক্ষ্য হলো সংগঠনের ভেতরের সমন্বয় বাড়ানো, নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব কমানো এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপিকে আরও সুসংগঠিত করা।
ফরিদা|চখ