প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে আসছেন আজ
বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন,হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলেমদের কবর জিয়ারত
সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আজ রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একদিনের সফরে তিনি বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি। হাটহাজারীতে প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ আলেমদের কবর জিয়ারত করারও কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সফরের বিভিন্ন ভেন্যু ও সড়কজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে চলছে সাজসজ্জা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকালে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের মহেশখালী যাবেন। সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। এরপর হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া এলাকায় যাবেন।
বাঁশখালীতে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহারা ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব ঘর নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা ও প্রস্তুতি। প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ ও একটি শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন নির্ধারিত অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে পুনর্বাসন সহায়তাও দেওয়া হবে।
বাঁশখালী থেকে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারযোগে ফটিকছড়ি যাবেন। সেখানে আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন তিনি। মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়িতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজী দিঘীর সিঅ্যান্ডবি মাঠে হেলিপ্যাড প্রস্তুত করা হয়েছে। হেলিপ্যাড থেকে বাবুনগর মাদ্রাসা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে সাজসজ্জা করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক তোরণ। সংশ্লিষ্ট সড়ক ও অনুষ্ঠানস্থলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ফটিকছড়ি থেকে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ বিশিষ্ট আলেমদের কবর জিয়ারত করবেন। পরে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বিশ্রাম নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
এরপর হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে। ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হবে।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ দিয়ে মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। তাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য টেকসই পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাঁশখালীতে ১০০টি পরিবারের জন্য নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। হাটহাজারীতেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও পুনর্বাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন সমস্যার দিকেও সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে।
ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এলাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রস্তাব তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, কয়েকটি কলেজ সরকারীকরণ, স্থানীয় গ্যাস সম্পদের সুষম ব্যবহার, চা ও রাবার বাগানে শিল্পভিত্তিক গ্যাস সংযোগ এবং অব্যবহৃত খাসজমিতে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সফরের প্রতিটি ভেন্যু ও সড়ককেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর সুন্দর ও নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসনের পুরো টিম কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে আড়াই থেকে তিন হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সফরের বিভিন্ন ভেন্যু, হেলিপ্যাড ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে পরিচ্ছন্নতা এবং সাজসজ্জার কাজ করা হয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, দিনের কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে দলীয় সাংগঠনিক কর্মসূচি শেষে রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তারেক রহমানের প্রথম চট্টগ্রাম সফর। তবে এবার সফরের মূল কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে চট্টগ্রামে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মানবিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বও বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
ফরিদা|চখ