জুলাই যোদ্ধা
ইমাদের শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল ২২ ছররা গুলি
আরাকান সড়ক সংলগ্ন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পাইরোল গ্রামে আব্দুল আওয়াল ইমাদের জন্ম। ব্যবসায়ী বাবার ৩ সন্তানের সবার বড় ইমাদ।। বিদেশ গমনের উদ্দেশে দ্য ইংলিশ একাডেমি তে আইএলটিএস করছিলেন। থাকতেন চট্টগ্রাম শহরে বন্ধুদের সাথে ব্যাচেলর বাসায়। দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ইমাদ বাসায় বসে থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন দেশ মাতৃকার টানে, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চুপচাপ স্বভাবের ইমাদ মামাতো ভাই মুজাহিদকে সাথে নিয়ে বহদ্দারহাট মোড়ে এসেছিলেন। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো কোটা সংস্কার আন্দোলনে।
দিনটি ছিলো চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতার জন্য এক কঠিনতর পরীক্ষার। সেদিন বহদ্দারহাট এলাকায় সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র আক্রমণে ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো বীর চট্টলার রাজপথ। রক্ত নদী পেরিয়ে ছাত্র-জনতাও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন কঠিন প্রতিরোধ। ইমাদের ভাষ্যমতে, বহদ্দা-রহাট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলির জবাব আমরা ইট-পাটকেল দিয়ে দিচ্ছিলাম। তাদের সশস্ত্র আক্রমণের মুখে অনেক সহযোদ্ধা আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেছিলো। তবুও আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বেশ কিছু গুলি এসে আমার কোমরের নিচ থেকে পায়ের বেশ কিছু জায়গায় লাগে। আমার শরীর থেকে তখন প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। এরপর আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ইমাদ প্রথম ফোনটি করেন তার বন্ধু রাকিবুল হক হেলালীকে। রাকিব বলেন, ইমাদ আমাকে ফোন দিয়ে তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদটি দেন। তার আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর আমরা তাকে উদ্ধার করার জন্য তৎপরতা শুরু করি। ইমাদের সাথে ফোনে কথা বলার অল্প কিছুক্ষণ পর তাকে আর ফোনে পাচ্ছিলাম না। এতে আমি খারাপ কিছু আশঙ্কা করছিলাম। যদিও পরবর্তীতে তার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। তার মামাতো ভাই মুজাহিদ তাকে রিক্সায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) সামনে নিয়ে আসলে আমি তাকে রিসিভ করি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র অবস্থানের কারনে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে না নিয়ে শেভরন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেদিন ইমাদের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) উপস্থিত কিছু সাংবাদিকের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে ইমাদের মামা জামাল উদ্দিন বলেন, ইমাদ বহদ্দারহাটে গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে এমন খবর পেয়ে আমি হাসপাতালে ছুটে যায়। হাসপাতালে ঢুকে সারিবদ্ধ লাশ দেখতে পেয়ে আমার তখন পাগল প্রায় অবস্থা। একটি লাশ দেখে আমার কাছে ইমাদের মতো মনে হয়েছিলো। তখন আমি ইমাদ শহীদ হয়েছে ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়ি। এতে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে ইমাদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। আব্দুল আওয়াল ইমাদ (২১) চন্দনাইশের বেগম গুল চেমন আরা একাডেমির (বিজিসি) এইচএসসি ২৩ ব্যাচের ছাত্র। প্রায় ২২ টি ছররা গুলির আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলো ইমাদের দেহ। ইমাদ এখনও সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন-সাথে সেই দিনের ভয়াল দুঃসহ স্মৃতি তো আছেই। ইমাদের সাথে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। তার কাছে সরকারি কোনো সহযোগিতাও পৌঁছায়নি।
দেশের অতন্দ্র প্রহরী ইমাদরা অবহেলার শিকার হলে হেরে যাবে বাংলাদেশ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন চট্টগ্রামের সমন্বয়ক রিদুয়ান সিদ্দিকী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা আহত ও শহীদ হয়েছেন তারা জাতীয় বীর। এই বীরদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আহত ও শহীদ পরিবারগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে আহবান জানাচ্ছি।
ফরিদা|চখ