chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

চট্টগ্রামে জুলাই শহীদের মামলা

রক্তের দাগ শুকিয়েছ, বিচার কি এগিয়েছে?

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ১২ জনের মৃত্যু  হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথিভুক্ত মামলায় ওয়াসিম আকরামসহ ১১ জনের হত্যার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক জুলাই আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—১. মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, তিনি চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুরে নিহত হন।

২. ফয়সাল আহমেদ শান্ত — ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী। ১৬ জুলাই মুরাদপুরে নিহত হন।
৩. মো. ফারুক — আসবাবপত্রের দোকানের কর্মচারী। ১৬ জুলাই মুরাদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
৪. তানভীর ছিদ্দিকী — আশেকান আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। ১৮ জুলাই বহদ্দারহাট এলাকায় নিহত হন। ৫. হৃদয় চন্দ্র তারুয়া — চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ৬. শহীদুল ইসলাম শহীদ — জুতার দোকানের কর্মচারী। ৩ আগস্ট বহদ্দারহাটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
৭. জামাল উদ্দিন — রিকশাচালক। ৮. মাহিন হোসেন সাইমুন — দোকান কর্মচারী। ৯. মো. আলম — কার্টন ফ্যাক্টরির কর্মচারী। ১০. মো. ইউসুফ — শ্রমিক। ১১. ইশমামুল হক — কলেজ শিক্ষার্থী। ১২. ওমর বিন নুরুল আবছার — শিক্ষার্থী।

১৬ জুলাই: চট্টগ্রামের রক্তাক্ত সূচনা

চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত দিনগুলোর একটি ১৬ জুলাই। ওই দিন মুরাদপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের সংঘর্ষে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও ফারুক নিহত হন। ওয়াসিম ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী এবং কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ফয়সাল আহমেদ শান্ত ছিলেন ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী। আর ফারুক একটি আসবাবের দোকানে কাজ করতেন। ফারুক ও শান্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং ওয়াসিম ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ওই দিনের হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরে ১৮ জুলাই বহদ্দারহাটে তানভীর ছিদ্দিকী নিহত হন। ৩ আগস্ট বহদ্দারহাটে গুলিতে প্রাণ হারান শহীদুল ইসলাম শহীদ।

মামলার অগ্রগতি: কোথায় কতদূর?

ওয়াসিমসহ ছয় হত্যা:

চট্টগ্রামের জুলাই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় আইনি অগ্রগতি এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।ওয়াসিম আকরামসহ চট্টগ্রামে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ মোট ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয় এবং পলাতক ১৮ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ৩০ জুন ২০২৬ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। অর্থাৎ এই মামলাটি এখন তদন্ত পর্যায় পেরিয়ে বিচার পর্যায়ে রয়েছে।

২. শহীদুল ইসলাম শহীদ হত্যা:

চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে শহীদুল ইসলাম শহীদ হত্যা মামলায়। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বহদ্দারহাটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ৩৭ বছর বয়সী শহীদুল ইসলাম শহীদ। পরদিন নয়, তার ভাই শফিকুল ইসলাম ১৯ আগস্ট চান্দগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে আটজনের নাম উল্লেখ করে ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। প্রায় এক বছর তদন্তের পর পুলিশ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ২৩১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এতে সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর নাম আসে। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। বাদীপক্ষ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন। এর মাধ্যমে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে যায়। তদন্তে ১২৮ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে—এর মধ্যে ২৮ জন সাধারণ নাগরিক, ৯৯ জন পুলিশ সদস্য এবং একজন চিকিৎসক রয়েছেন।

৩. তানভীর ছিদ্দিকী হত্যা:

১৮ জুলাই বহদ্দারহাট এলাকায় নিহত হন আশেকান আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর ছিদ্দিকী।
তার হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট রাতে চান্দগাঁও থানায় মামলা করা হয়। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ৩৪ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারে আরও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আন্দোলনকারীদের ওপর অস্ত্র নিয়ে হামলা ও গুলিবর্ষণের সময় তানভীর গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ মামলায় চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গ্রহণ বা বিচার শুরুর সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

৪. ফারুক হত্যা:

১৬ জুলাই মুরাদপুরে নিহত ফারুকের ঘটনায় পৃথক হত্যা মামলা করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট পাঁচলাইশ থানায় তার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় হাছান মাহমুদ, নওফেলসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়। মুরাদপুরের ওই ঘটনায় ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুক—তিনজনের মৃত্যু নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছিল। এসব মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্ত চলমান থাকার কথা জানা যায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১১ জনকে হত্যার অভিযোগে মামলা হলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এসেছে ছয়জনের হত্যাকাণ্ড ঘিরে। আবার পৃথক হত্যা মামলায় শহীদুল ইসলাম ও তানভীর ছিদ্দিকীর মতো নিহতদের পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। অর্থাৎ সব নিহতের মামলা একই গতিতে এগোয়নি।

ফরিদা|চখ

এই বিভাগের আরও খবর