চট্টগ্রামে গ্যাসের জন্য হাহাকার
চুলায় আগুন নেই, শিল্পে উৎপাদন কম, সিএনজি গাড়িতে দীর্ঘ লাইন—বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎকণ্ঠা
চট্টগ্রাম নগরীতে গ্যাস সংকট এখন আর শুধু বাসাবাড়ির রান্নাঘরের সমস্যা নয়—এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও নগরজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলায় আগুন জ্বলছে না, কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির সারি। গ্যাসনির্ভর শিল্পে কমছে উৎপাদন, বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির ব্যয়।
সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ২৬ জুলাইয়ের হিসাবে চট্টগ্রাম দিনে প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে পেয়েছে ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬৪ শতাংশ। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট।
চুলায় আগুন নেই, রান্নাঘরে দুর্ভোগ
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের একটি বড় সময় গ্যাসের চাপ কম থাকছে কিংবা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুপুর থেকে সন্ধ্যার দিকে অনেক বাসাবাড়িতে রান্না করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকার পর কোনো কোনো দিন দুপুরের পর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে গ্যাস এলেও চাপ থাকছে খুব কম। এতে রান্না, শিশুদের খাবার তৈরি ও পানি গরম করার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি কিংবা বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বাড়ছে।
গ্যাসের বিকল্পে বাড়ছে এলপিজির চাপ
গ্যাস সংকট দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই নগরবাসীর একটি অংশ এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে চুলা ও সিলিন্ডারের চাহিদাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক এক সংকটের সময় চট্টগ্রামের কর্নেলহাট, বিবিরহাট ও টেকনিক্যাল এলাকার বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৪৩০ টাকায় বিক্রির তথ্যও পাওয়া গেছে। একটি দোকানে একদিনে ৫০টির বেশি সিলিন্ডার বিক্রি এবং অন্য একটি দোকানে সকাল থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার সিলিন্ডার ও চুলা বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট একদিকে যেমন ভোগান্তি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন নিয়ে বড় উৎকণ্ঠা
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ইস্পাত, কাচ, সিমেন্ট, পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সংকটের আগে থেকেই চট্টগ্রামের ভারী শিল্পে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। শিল্প উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। শিল্পখাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ গ্যাসও সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
কাচশিল্পে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
গ্যাস সংকটে কাচশিল্পের ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি। কারণ কাচ তৈরির চুল্লি একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল।
চট্টগ্রামের শিল্প উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ কম থাকায় চুল্লি সচল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও ডিজেল মজুত রেখে বিকল্পভাবে চুল্লির বার্নার সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইস্পাত শিল্পেও ধাক্কা
চট্টগ্রামে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদকদের একাধিক বড় কারখানা রয়েছে। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল বিলেট উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রড উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও ঝুঁকিতে পড়ছে। গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় কোনো কোনো কারখানায় ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সিমেন্ট শিল্পেও বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
সিমেন্ট কারখানায় গ্যাস শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নয়, নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাসের চাপ কমে গেলে ক্যাপটিভ পাওয়ার চালানো কঠিন হয়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প জ্বালানি বা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিদ্যুৎ ও উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয় তৈরি হয়।
সিএনজি গাড়িতে দীর্ঘ লাইন
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ট্যাক্সি ও অন্যান্য যানবাহনে। ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি, কোথাও আবার ‘গ্যাস নেই’ লেখা ঝুলছে। সাম্প্রতিক সংকটের সময় ষোলশহরসহ নগরের বিভিন্ন স্টেশনে শত শত সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এতে চালকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। একজন চালক যে সময়টুকু রাস্তায় যাত্রী বহন করে আয় করতে পারতেন, সেই সময়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে।
ফলে একদিকে চালকের আয় কমছে, অন্যদিকে গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। সংকট দীর্ঘ হলে নগর পরিবহনে এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে।
ভাড়া বাড়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না
সিএনজি সংকট দীর্ঘ হলে পরিবহন খাতে একাধিক চাপ তৈরি হয়। প্রথমত, চালকের কর্মঘণ্টা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, গ্যাসের পরিবর্তে কোনো কোনো গাড়িকে বেশি ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হতে পারে। তৃতীয়ত, রাস্তায় পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকলে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া দাবি করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ফলে গ্যাস সংকট শেষ পর্যন্ত নগরবাসীর পরিবহন ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানকার শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটি অংশ নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
কারখানায় উৎপাদন কমলে কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। উৎপাদন কমে গেলে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ কঠিন হয়, বাড়ে শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির অলস সময়, আর বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ে।
চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে অনিশ্চয়তা। কখন গ্যাসের চাপ কমবে, কখন সরবরাহ বন্ধ হবে কিংবা কখন স্বাভাবিক হবে—এই অনিশ্চয়তায় দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যাপটিভ পাওয়ারেও সংকট
চট্টগ্রামের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল।
গ্যাসের চাপ কমলে ক্যাপটিভ জেনারেটরও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ দিতে পারে না। ফলে উৎপাদন লাইন ধীর হয়ে যায় বা বন্ধ রাখতে হয়। বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করলে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।
কেজিডিসিএলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ক্যাপটিভ পাওয়ারের ২০৪টি গ্রাহক রয়েছে। শিল্পগ্রাহক রয়েছে ৯৬২টি।
সমস্যার মূল কোথায়?
চট্টগ্রামের বর্তমান গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড/কারিগরি ত্রুটি এবং সেখান থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অনেকাংশে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। একটি টার্মিনালে সমস্যা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের ওপর। অগ্নিকাণ্ডের পর দুই টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগুনের আগে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। পরে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
তবে এটি কেবল সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সমস্যা নয়। কেজিডিসিএল কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ আগে থেকেই কম ছিল। টার্মিনালের সমস্যায় সেই ঘাটতি আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভরতার চিত্র
কেজিডিসিএলের আওতায় চট্টগ্রাম নগরসহ নয়টি উপজেলা এবং রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী পেপার মিল রয়েছে। কোম্পানিটির প্রায় ৬ লাখের বেশি গ্রাহক সংযোগ রয়েছে; এর বড় অংশ আবাসিক। এসব খাতে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট বলে কেজিডিসিএল-সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধৃত হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সংকটে চট্টগ্রামে দৈনিক সরবরাহ ২২-২৩ কোটি ঘনফুটের আশপাশে নেমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে কেজিডিসিএল। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, ২৫-২৮ কোটি ঘনফুট পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ফরিদা|চখ