chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

নিত্যপণ্যে মিশছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

সয়াবিন তেল, দুধ কিংবা টুথপেস্ট—প্রতিদিনের ব্যবহার্য এসব পণ্যের সঙ্গে অজান্তেই শরীরে ঢুকতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ৫ মিলিমিটারের কম আকারের এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা এখন খাদ্য, পানি ও পরিবেশে বহুলভাবে শনাক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় নিত্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সয়াবিন তেলে হাজার হাজার কণা ২০২৬ সালে Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি গবেষণায় বাজারের ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের ৬০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। নন-ব্র্যান্ডেড তেলে গড় উপস্থিতি ছিল প্রতি লিটারে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি, আর ব্র্যান্ডেড তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি।

গবেষণায় পাওয়া কণার ৮২.৫ শতাংশ ছিল তন্তু বা ফাইবারজাতীয়। শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিকের মধ্যে ছিল LDPE, HDPE, PP, PET, polyurethane ও nylon। গবেষকদের মতে, কাঁচামাল, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, প্লাস্টিকজাত পাইপ-ফিল্টার, প্যাকেজিং, পরিবহন ও সংরক্ষণ—বিভিন্ন পর্যায় থেকেই দূষণ ঘটতে পারে।

দুধেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় পরীক্ষিত সব ধরনের বাণিজ্যিক দুধেই কণা পাওয়া যায়; খোলা গুঁড়া দুধে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১,২৮৬.৭১টি কণা শনাক্ত হয়। গবেষকেরা প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে সম্ভাব্য বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

২০২৬ সালের আরেক বাংলাদেশি গবেষণাতেও কাঁচা, ব্র্যান্ডেড ও প্রক্রিয়াজাত দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সেখানে ব্র্যান্ডেড দুধে গড়ে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ১৫৬.০৬টি কণা শনাক্ত হয়। শিশুদের খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি এক্সপোজারের আশঙ্কার কথাও গবেষণায় উঠে এসেছে।

টুথপেস্টেও ভয়াবহ চিত্র

শুধু খাদ্য নয়, মুখের পরিচর্যার পণ্যও এ ঝুঁকির বাইরে নয়। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ESDO)-এর ২০২৫-২৬ সালের এক বছরব্যাপী গবেষণায় বাংলাদেশের বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতে বা ৭৬.৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। ১৯টি দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও টুথপেস্টসহ বিভিন্ন oral-care পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তের প্রমাণ রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে—এটি নিয়ে গবেষণা বাড়ছে। কিন্তু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ঠিক কতটা, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

সম্ভাব্য উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে প্রদাহ, কোষীয় ক্ষতি এবং প্লাস্টিকের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব। তবে এসব সম্ভাব্য ঝুঁকিকে নিশ্চিত রোগের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্কতার বাইরে হবে।

করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—নিত্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নিয়মিত পরীক্ষা, জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ, উৎপাদন ও প্যাকেজিং পর্যায়ে নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ। ভোক্তারাও অতিরিক্ত প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাতে পারেন; বিশেষ করে গরম খাবার বা পানীয় প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা এবং দীর্ঘদিন প্লাস্টিক পাত্রে খাদ্য সংরক্ষণ এড়িয়ে চলা যেতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়—এটি খাদ্যনিরাপত্তারও নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই সয়াবিন তেল থেকে দুধ, টুথপেস্ট থেকে অন্যান্য নিত্যপণ্য—‘প্যাকেটজাত মানেই নিরাপদ’ এমন ধারণার পাশাপাশি পণ্যের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিরাপত্তাও ভবিষ্যৎ খাদ্য ও ভোক্তা নিরাপত্তার আলোচনায় আনতে হবে।

ফরিদা|চখ

 

এই বিভাগের আরও খবর