chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্ম

‘১০০ টাকা লাগান, জিতলে ২৫০ টাকা পাবেন’—এমন লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েই শুরু। প্রথমে সামান্য জিতিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বাজির পরিমাণ। একসময় লাভের আশায় ধারদেনা, সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন—সবকিছু ঢেলে দেন অনলাইন জুয়ার অ্যাপে। শেষ পর্যন্ত জেতার বদলে নিঃস্ব হয়ে পড়েন অসংখ্য তরুণ।

চট্টগ্রামেও অনলাইন জুয়ার এই ভয়াবহ বিস্তার এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর থেকে উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও মোবাইল ফোন ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া ও অর্থপাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অনলাইন জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে অন্তত ছয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত মে মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন বেটিং ও অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে জুলাইয়ে পটিয়ায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও সেটি প্রচলিত জুয়ার আসর; অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক

সিআইডির অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনলাইন বেটিং ও অবৈধ অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে মোবাইল ফোন, ব্যাংকের এটিএম কার্ড ও চেকবই জব্দ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও অন্যান্য আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে সরানো হয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে পাচারের অভিযোগও উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামের পটিয়ায়ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনায় ব্যবহৃত তিনটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে, অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক শুধু নগরকেন্দ্রিক নয়; উপজেলা পর্যায়েও এর বিস্তার ঘটেছে।

শুরুতে জিতিয়ে তৈরি করা হয় আসক্তি

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলো অনেক সময় নতুন খেলোয়াড়কে শুরুতে জিতিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। খেলোয়াড় মনে করেন, তিনি কৌশল করে নিয়মিত আয় করতে পারবেন। এরপর ধীরে ধীরে বাজির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
কেউ ১ হাজার টাকা জমা দিলে কোনো কোনো প্ল্যাটফর্মে বোনাসসহ ব্যালান্স বাড়িয়ে দেখানো হয়। প্রথমদিকে কিছু অর্থ জেতার সুযোগও থাকে। কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা জিতলেও তা তুলতে নানা শর্ত আরোপ করা হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেলা বা বাজি সম্পন্ন না করলে টাকা উত্তোলনের সুযোগ থাকে না। ফলে জেতা অর্থ আবার খেলায় বিনিয়োগ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মূলধনও হারিয়ে ফেলেন অনেকে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তরুণদের মধ্যেও এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। চাকরি, ব্যবসা কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেকে অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার গ্রুপ ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা হচ্ছে ‘সহজে আয়’-এর নানা প্রলোভন।

এজেন্ট চক্রই বিস্তারের মূল শক্তি

অনলাইন জুয়ার সাইটে প্রবেশের জন্য সাধারণত নাম, মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এ কাজটি অনেক সময় স্থানীয় এজেন্টরা করে দেন। একজন এজেন্ট আবার নতুন এজেন্ট তৈরি করে। এভাবে শহর থেকে উপজেলা ও গ্রাম পর্যন্ত গড়ে ওঠে বিশাল নেটওয়ার্ক।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিভিন্ন নম্বর ব্যবহার করে টাকা জমা ও উত্তোলন করা হয়। ফলে একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও নতুন ডোমেইন, নতুন অ্যাপ কিংবা নতুন এজেন্টের মাধ্যমে আবার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এজেন্ট গ্রেপ্তার করে অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মূল অবকাঠামো বন্ধ করার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের চ্যানেল শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুয়া বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং স্থানীয় এজেন্ট নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

চট্টগ্রামে বাড়ছে সামাজিক ঝুঁকি

অনলাইন জুয়ার ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পারিবারিক অশান্তি, ঋণগ্রস্ততা, প্রতারণা, চুরি, আত্মগোপন, মানসিক চাপ এবং নানা ধরনের অপরাধ। অনেক তরুণ প্রথমে নিজের টাকা দিয়ে শুরু করলেও পরে বন্ধু, পরিবার কিংবা বিভিন্ন উৎস থেকে ধার করে খেলায় জড়িয়ে পড়েন। টাকা পরিশোধ করতে না পেরে কেউ কেউ প্রতারণা বা অপরাধের পথেও পা বাড়ান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এটি তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের জন্য বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বেকারত্ব, দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা, সহজলভ্য স্মার্টফোন ও ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ অনলাইন জুয়ার বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত

চট্টগ্রামে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিআইডি ও স্থানীয় পুলিশ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জুয়া চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছে। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল গ্রেপ্তার ও সাইট বন্ধ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তরুণদের বুঝতে হবে—অনলাইন জুয়া কোনো বিনিয়োগ নয়, এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে দীর্ঘমেয়াদে খেলোয়াড়ের জেতার সম্ভাবনা নয়, বরং প্ল্যাটফর্মের লাভ নিশ্চিত করা হয়। ‘সহজে টাকা’ পাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে যে ফাঁদ পাতা হচ্ছে, সেখানে শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হওয়ার ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি।

চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ফরিদা|চথ

এই বিভাগের আরও খবর