আনোয়ারায় চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবণা
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেড) প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে আগামী সোমবার (২৭ জুলাই)। এর মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্প প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আনোয়ারাকে এ প্রকল্পের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরের পর পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) সুবিধার আওতায় বৈদেশিক অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪ দশমিক ২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিসিএল) চেয়ারম্যান স্বাগত বক্তব্য দেবেন। অনুষ্ঠানে সিইআইজেড প্রকল্পের ওপর একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা প্রদর্শন করা হবে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দেশি-বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত থাকবেন।
অনুষ্ঠানে একটি সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষর, সিইআইজেডের স্লোগান উন্মোচন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের উদ্বোধন, প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি হবে।
আনোয়ারা স্বাধীন চেতনার প্রজন্ম ফাউন্ডেশনের সভাপতি ফরহাদুল ইসলাম বলেন, “আনোয়ারা দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার। চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “চাইনিজ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এই অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।”
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় এক দশক পর সেই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।
ফরিদা|চখ