জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব :
ঘুম হারানোর শীর্ষে চট্টগ্রামের মানুষ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুধু দিনের তাপমাত্রাই বাড়ছে না, উষ্ণ হয়ে উঠছে রাতও। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ঘুমে। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর মানুষ বছরে ৭২ থেকে ৮৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম হারাচ্ছেন। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
গবেষণা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সত্তরের দশকের তুলনায় বর্তমানে রাতের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ঘুমের ক্ষতি অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র রাত মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবে কিছুটা ঠান্ডা হতে চায়। কিন্তু রাতের তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় এবং পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও শরীর ও মন বিশ্রাম পায় না।
চট্টগ্রামে ঝুঁকি বেশি কেন?
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রুত নগরায়ণ। কংক্রিটের ভবন, যানবাহনের তাপ, কমে যাওয়া সবুজ এলাকা এবং ঘনবসতি শহরের তাপমাত্রা ধরে রাখছে। দিনের বেলা জমে থাকা তাপ রাতেও পুরোপুরি কমছে না।
এর সঙ্গে চট্টগ্রামের উচ্চ আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে। বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকায় ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বদ্ধ ঘর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতে ঘুমের অস্বস্তি আরও বাড়ে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব ও অতিরিক্ত আর্দ্রতাও নগরবাসীর ঘুমে বাড়তি বিঘ্ন ঘটায়।
ঘুমের ঘাটতি বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষের কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যায়। দেখা দিতে পারে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, মানসিক চাপ ও স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা।
দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকলে তা ঘুমজনিত রোগের লক্ষণ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সতর্কবার্তা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস বা তাপপ্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের প্রতিদিনের ঘুমের মতো মৌলিক প্রয়োজনও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতের তাপমাত্রা কমাতে নগর পরিকল্পনায় বেশি করে গাছ লাগানো, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, ছাদবাগান বৃদ্ধি এবং শহরে সবুজ এলাকা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণে প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
চট্টগ্রামের মানুষের ঘুম হারানোর এই প্রবণতা তাই শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়—এটি জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সম্মিলিত প্রভাবের একটি বড় সতর্কবার্তা।
দিনের পরিশ্রম শেষে মানুষ যে রাতকে বিশ্রামের সময় হিসেবে পায়, সেই রাতই যদি ক্রমেই উষ্ণ ও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায়।
ফরিদা|চখ