chattolarkhabor
চট্টলার খবর - খবরের সাথে সারাক্ষণ

বন্যার পানিতে ভেসে গেল চট্টগ্রামের ‘অর্থনীতির চাকা’

বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে।কিন্তু চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে এখনো শুকায়নি খামারিদের চোখের জল। কোথাও খালি গোয়ালঘর, কোথাও নিস্তব্ধ পোল্ট্রি শেড, আবার কোথাও পচে যাওয়া খড়ের স্তূপ। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল শুধু মানুষের বসতঘর নয়, প্রাণিসম্পদ খাতেরও বড় একটি ভিত্তি নড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা। প্রাণী বাঁচলেও নেই খাবার, আর যাদের খামার তলিয়ে গেছে তাদের সামনে এখন টিকে থাকার লড়াই।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের প্রাথমিক জরিপ বলছে, জেলার ১৫টি উপজেলায় বন্যার কবলে পড়েছে ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫৫৫টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। প্রাণীর মৃত্যু, খামার ধ্বংস এবং পশুখাদ্য নষ্ট মিলিয়ে প্রাথমিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকা। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও বড় হবে।

জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পোল্ট্রি খাতে। বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০টি মুরগি ও ১৫ হাজার ৬০০টি হাঁস। মারা গেছে ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি এবং এক হাজার হাঁস। গবাদিপশুর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৮০ হাজার ৩২০টি গরু, ৩২৫টি মহিষ, ৬০ হাজার ৫০০টি ছাগল এবং ১০ হাজার ৩১০টি ভেড়া। এর মধ্যে মারা গেছে ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল এবং ৪০টি ভেড়া।

তবে প্রাণীর মৃত্যুর চেয়েও বড় বিপর্যয় তৈরি হয়েছে খাদ্য সংকটে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে ১৭ হাজার ৮৪০ টন পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার ৭৬০ টন খড়, ৬ হাজার ৮০ টন কাঁচা ঘাস এবং ১১৮ টন দানাদার হাঁস-মুরগির খাদ্য। শুধু খাদ্য নষ্ট হওয়ার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৪ কোটিরও বেশি টাকা। ফলে যেসব গবাদিপশু বেঁচে আছে, সেগুলোকে খাবার জোগানোই এখন খামারিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৫টি গবাদিপশু ও পোল্ট্রি খামার। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ২২টি, পটিয়ায় ২০টি এবং সাতকানিয়ায় ১৫টি গবাদিপশুর খামার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ায় দুটি করে এবং হাটহাজারীতে তিনটি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোল্ট্রি খামারের মধ্যে বাঁশখালীতে সাতটি, সাতকানিয়ায় ছয়টি, ফটিকছড়িতে চারটি, হাটহাজারী ও চন্দনাইশে তিনটি করে এবং কর্ণফুলীতে দুটি খামার ক্ষতির মুখে পড়েছে।
উপজেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বাঁশখালীতে। সেখানে ১২ হাজার ৫১০টি গরু, ৮ হাজার ২৩০টি ছাগল এবং ১ লাখ ৫৫টি মুরগি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ১২টি গরু, ৩৯টি ছাগল এবং ২০ হাজার ২০০টি মুরগি। সাতকানিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯৮০টি গরু ও ৯ হাজার ৬৫০টি ছাগল। সেখানে মারা গেছে আটটি গরু ও ৩৯টি ছাগল। এছাড়া সন্দ্বীপে তিনটি, আনোয়ারায় চারটি, হাটহাজারীতে তিনটি, কর্ণফুলীতে দুটি, পটিয়ায় দুটি এবং মীরসরাইয়ে একটি গরু মারা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে পুনরায় যাচাই করা হবে। ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন এবং পশুখাদ্য সহায়তার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হয়েছে প্রাণিসম্পদ খাতের দুর্বলতা। মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও গবাদিপশু রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক খামারি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোয়ালঘর ছাড়তে পারেননি। আবার যারা প্রাণী রক্ষা করতে পেরেছেন, তারা এখন খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে পড়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা, বিনামূল্যে পশুখাদ্য ও ভেটেরিনারি সেবা নিশ্চিত করা না গেলে এই ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী কয়েক মাসে মাংস, দুধ ও ডিমের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই এসে পড়বে।

এই বিভাগের আরও খবর