চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যায় মৃত্যু ৩৯, পানিবন্দি ৯ লাখ মানুষ
টানা কয়েক দিনের রেকর্ডভাঙা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৩ জন (এর মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা), চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙ্গামাটিতে ২ জন রয়েছেন। বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার কারণে।
এদিকে শুক্রবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬টি উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে হাজার হাজার বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা
সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি থাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান বলেন, অনেক এলাকায় অন্তত ১ হাজার ৫০০ পরিবার চরম দুর্ভোগে রয়েছে। ত্রাণ বরাদ্দ থাকলেও পানির তীব্রতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেগুলো পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলায় ৪ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে না পারাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীর স্পিডবোটের মাধ্যমে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকায়ও বিপর্যয়
কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরীসহ ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বহু এলাকায় ঘরবাড়িতে বুকসমান পানি ওঠায় রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। নিরাপদ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের কারণে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং উদ্ধারকাজে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে কাজ করছেন।
ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার
জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
তবে দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এখনো অনেক মানুষ ত্রাণসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। প্রশাসনের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগের সতর্কতা
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নগদ অর্থ, চাল, শুকনো খাবার ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
ফরিদা|চখ