জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত পেকুয়া, ৭ ইউনিয়ন পানিবন্দি
টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিভিন্ন স্লুইসগেট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো পরিবার। পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়েছে একাধিক বেড়িবাঁধ, ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাত এবং ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পেকুয়া পৌরসভার শেখের কিল্লাঘোনা, হরিণাফাঁড়ি, গোঁয়াখালী, জালিয়াখালী-মগকাটা, মেহেরনামার ছড়াপাড়া, বলীরপাড়া-মোরারপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও বাগগুজারা বাজার এলাকায় বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া শিলখালী ইউনিয়নের মুন্সিমোড়া, রাজাখালীর পালাকাটা, মগনামা ইউনিয়নের শরৎঘোনা, টৈটং ইউনিয়নের মিত্যান্তঘোনা, বারবাকিয়া ইউনিয়নের জালিয়াকাটা এবং উজানটিয়া ইউনিয়নের করিমদাদ মিয়ার ঘাটসহ আরও বহু গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। গবাদিপশুর গোয়ালঘর প্লাবিত হওয়ায় পশুগুলোকে উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে খামারিদের।
পেকুয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি মৎস্য খাতও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। উপজেলার অধিকাংশ মাছ ও চিংড়ি চাষের প্রকল্পে পানি ঢুকে পড়েছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি এবং বেড়িবাঁধের ঝুঁকির কারণে মাছ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন প্রকল্প মালিকরা। এতে কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়া বেড়িবাঁধ এবং পেকুয়া পৌরসভার কাটাফাড়ি বেড়িবাঁধকে ঘিরে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বেড়িবাঁধের কোনো অংশ ভেঙে গেলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেন, “উজানটিয়ার মানুষ একদিকে পানিবন্দি, অন্যদিকে টেকপাড়া বেড়িবাঁধ নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। উপজেলার কয়েকটি স্কুল ও মাদ্রাসার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন সড়কে গাছ উপড়ে পড়েছে। ফলে অনেক এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের ক্ষতির কারণে কয়েকটি গ্রাম এখনও বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, “এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা আগেই ছিল। এখন জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য জরুরি ত্রাণ ও সহায়তা প্রয়োজন।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অতিবৃষ্টিতে অধিকাংশ হাট-বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক দোকানপাট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
মৎস্য প্রকল্পের মালিক ও সাবেক ইউপি সদস্য মমতাজুল ইসলাম বলেন, “জীবনের সব সঞ্চয় মৎস্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছি। প্রকল্পে পানি ঢুকে পড়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ব।”
জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে বলে জানান পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম. বাহাদুর শাহ।
তিনি বলেন, “স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। কহলখালী খালের স্লুইসগেটের জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য স্লুইসগেটও পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত পানি নেমে যেতে পারে।”
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পেকুয়ার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে খাল-নালা পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের টেকসই সংস্কার এবং স্লুইসগেটগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই উপজেলার হাজারো মানুষকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
তাসু/চখ
