১৬ বছরের রঙিন পথচলার শেষ, বিদায় জানালেন নেইমার
ফিফা বিশ্বকাপে বেজে উঠল ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচের শেষ বাঁশি, আর এরই সাথে ব্রাজিলের জার্সিতে দীর্ঘ ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারকে বিদায় জানালেন ব্রাজিলিয়ান তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়র। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নেইমার বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো। এখন সব শেষ।”
যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। কিন্তু সেই গোলও সেলেসাওদের বিদায় ঠেকাতে পারেনি। নরওয়ের জয়ে ব্রাজিল ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে।
বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের আবেগ, শিল্প আর স্বপ্নের প্রতীক। বল পায়ে তাঁর জাদুকরী ড্রিবলিং, ক্ষিপ্র গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং অবিশ্বাস্য সৃজনশীলতা বিশ্ব ফুটবলকে বছরের পর বছর মুগ্ধ করেছে। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি গড়েছেন অনন্য রেকর্ড।
২০১৩ সালে জিতেছেন ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ এবং ২০১৬ রিও অলিম্পিকে এনে দিয়েছেন ব্রাজিলের ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক।২০১১ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপেও তিনি দলকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন।
ক্লাব ফুটবলে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা এবং ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি)-এর হয়ে নেইমার ট্রফির স্তূপ সাজিয়েছেন। বার্সেলোনার ২০১৪-১৫ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং উয়েফা সুপার কাপ জেতেন। কাতালান ক্লাবটির হয়ে তিনি ২টি লা লিগা এবং ৩টি কোপা দেল রে শিরোপার স্বাদ নেন।
পরবর্তীতে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে যোগ দিয়ে সেখানে ঘরোয়া লিগে আধিপত্য বিস্তার করেন। প্যারিসের দলটির হয়ে তিনি ৫টি লিগ ওয়ান শিরোপার পাশাপাশি ৩টি কুপ দে ফ্রান্স ট্রফি নিজের করে নেন।
ইউরোপে পাড়ি জমানোর আগেই নেইমার লাতিন আমেরিকার ক্লাব ফুটবলে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোসের হয়ে তিনি ২০১১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট কোপা লিবার্তাদোরেস জয় করেন, যা পেলে-পরবর্তী যুগে সান্তোসের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
এ ছাড়া সান্তোসের জার্সিতে তিনি একটি রেকোপ সুদামেরিকানা এবং ২০১০ সালে একটি কোপা দো ব্রাসিল (ব্রাজিলিয়ান কাপ) জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনেও নেইমারের ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ২০১১ সালে সান্তোসের হয়ে এক চোখধাঁধানো গোলের জন্য তিনি ফিফা পুসকাস পুরস্কার লাভ করেন।
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার হিসেবে ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা দুইবার বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি। ইউরোপে এসে ২০১৭-১৮ মৌসুমে পিএসজির হয়ে নিজের প্রথম বছরেই ফরাসি লিগের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিগ ওয়ান প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ ট্রফিটি অর্জন করেন।
এ ছাড়া ২০১৪-১৫ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার কৃতিত্ব অর্জন করেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’-এর মঞ্চে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে দুইবার তৃতীয় সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালে নিজের মাটিতে ইনজুরি, ২০১৮ সালে অশ্রু, ২০২২ সালে হতাশা এবং ২০২৬ সালে শেষ বিদায়—প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন তাঁর জীবনের একেকটি আবেগঘন অধ্যায়। অসংখ্য চোট, সমালোচনা, প্রত্যাশার পাহাড় আর বারবার ফিরে আসার অদম্য মানসিকতা তাঁকে আরও বড় করে তুলেছে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন নেইমারের চোখ ভিজে উঠল, তখন শুধু একজন ফুটবলারের নয়, শেষ হয়ে গেল ব্রাজিল ফুটবলের এক স্বর্ণালি যুগেরও।
যে কিশোর একদিন সান্তোসের জার্সিতে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল, সেই ছেলেটিই আজ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে রেখে গেল অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, অবিশ্বাস্য সব গোল, চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং এবং অগণিত আবেগের গল্প।
ব্রাজিলের জার্সিতে আর কখনও মাঠে দেখা যাবে না নেইমারকে। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে পেলে, রোনালদো, রোমারিও, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো ও কাকার মতো কিংবদন্তিদের পাশে।
বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো তাঁর হাতে ধরা দেয়নি, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর হৃদয়ের মঞ্চে তিনি আজীবন একজন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কারণ কিছু কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়—তাঁদের পরিচয় মানুষের স্মৃতিতে, আবেগে এবং ফুটবলের সৌন্দর্যে।
তাসু/চখ
