কৃষকের স্বপ্ন কোল্ড স্টোরেজ এবং বাস্তবতা
বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে টমেটো ভর্তি ঝুড়ি মাথায় হিমঘরের দিকে কৃষকের লাইন। এই গ্রামে টমেটোর সাথে সমান তালে চাষ হয় শিম, কাচ মরিচ, গাজ, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ আরোও কত রকম সবজি। কোল্ড স্টোরেজ যেখানটাতে রাখা হয়েছে এক এক করে সাজিয়ে রাখা হবে সেখানে। লাল টমেটো, সবুজ কাচা মরিচ, সাদা ফুল কপিতে যে কারো চোখে আরাম লাগবে। কৃষকের স্বপ্ন কোল্ড স্টোরেজ নিয়ে এই গল্পের পেছনে যে আরেকটি গল্প থাকে তার খবর কয়জনই বা রাখেন।
মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের গল্প শোনালেন নতুন রঙ লাগিয়ে। ২ হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি এর সুবিধা পাবেন। কৃষক মৌসুমে উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করতে পারবেন এবং ন্যায্যমূল্য পাবেন। টমেটো ও কাচা মরিচের দ্রুত পচনের কথাও মনে করিয়ে দেন। কিন্তু বাস্তবে কোল্ড স্টোরেজে কৃষকের সুদিন কতটুকু ফিরবে তার অপেক্ষায় থাকতে হবে।।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ও পচনশীল পণ্যের অপচয় রোধে সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে সৌর শক্তিচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনা প্রহণ করেছে। কৃষকের ক্ষেতে টমেটো পঁচে যায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনেক সময় কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হন। এ সমস্যা সমাধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে সৌরচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ অফ-গ্রিড, পরিবেশবান্ধব এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মিনি কোল্ড স্টোরেজের ধরন ও খরচ সাধারণ কোল্ড স্টোরেজের চেয়েও সোলার মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ খরচ প্রায় ৭০% কম।
এটি প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে :
১. কন্টেইনার মডেল: এটি আমদানিকৃত মালবাহী কন্টেইনার দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এতে প্রায় ১০ টন পর্যন্ত পণ্য সংরক্ষণ করা যায়। এর আনুমানিক খরচ ১৫ লাখ টাকা।
২. হাউসহোল্ড মডেল : এই ছোট মডেলটিতেও প্রায় ১০ টন ধারণক্ষমতা থাকে এবং এর খরচ প্রায় ৫ লাখ টাকা।
সুবিধাসমূহ
বিদ্যুৎবিহীন কুলিং: সোলার প্যানেল এবং থার্মাল এনার্জি স্টোরেজ (বরফ প্রযুক্তি) ব্যবহারের মাধ্যমে রোদ না থাকলেও বা রাতের বেলা নিরবচ্ছিন্ন ঠান্ডা বাতাস সরবরাহ করা যায়।
স্মার্ট কন্ট্রোল: ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ দিয়ে দূর থেকেই ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কৃষকের লাভ: পচনশীল শাকসবজি, ফলমূল ও আলু অনেক দিন পর্যন্ত তাজা থাকে, ফলে ভরা মৌসুমে বাধ্য হয়ে পানির দরে পণ্য বিক্রি করতে হয় না।
এই কোল্ড স্টোরেজ গল্পে শুনতে যতটা ভালো লাগে বাস্তবে এর ব্যবস্থাপনা ততই কঠিন:
মিনি কোল্ড স্টোরেজগুলো বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে অকেজো বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূল সংরক্ষণের জন্য এই প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং অব্যবস্থাপনার কারণে তা কৃষকদের খুব একটা উপকারে আসছে না মিনি কোল্ড স্টোরেজ।
সৌরবিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের উভয় সুবিধায় চলার কথা থাকলেও নিয়মিত পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে এগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হয়। ফলে টমেটো, শিম ও ফুলকপির মতো পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের পরও আশানুরূপ লাভ না হওয়ায় কৃষকরা এগুলো ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষিকে শক্তিশালী করতে হবে। সে লক্ষ্যে সরকার বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, কৃষকরা উৎপাদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে ন্যায্যমূল্য পান না। বিশেষ করে সবজি ও পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে মৌসুমে দাম কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে কৃষকদের দোরগোড়ায় সংরক্ষণ সুবিধা পৌঁছে দিতে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষককে নিয়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় এসব কোল্ড স্টারেজ পরিচালিত হবে এবং এগুলো সৌরবিদ্যুৎচালিত হবে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পে এ ব্যবস্থার সফলতা পাওয়া গেছে।
এতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজার চাহিদার মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে সরকার ডাটাবেসভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এতে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারবেন এবং ভোক্তারাও সারা বছর তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে কৃষিপণ্য পাবেন।
কৃষি কার্ডের কারণে সারা দেশের কৃষকদের একটি ডেটাবেস তৈরি হবে। এতে করে কোন অঞ্চলে কী ফসল উৎপাদন হয় তা আমরা জানতে পারবো। কোনো এলাকায় আলু বেশি উৎপাদন হবে তাদের বলে দিতে পারবো চাহিদা কতো। তখন কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারবে। যোগান ও চাহিদার সামঞ্জস্য থাকলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা করতে পারবে না।
তিনি বলেন, একেক মৌসুমে একেক সবজি বেশি উৎপাদন হয়। বেশি উৎপাদনের কারণে চাহিদার বেশি সবজির দাম পাওয়া যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষকের ক্ষেতে টমেটো আছে৷ কিন্তু দাম না পাওয়ায় টমেটো তুলে না। কারণ ক্ষেত থেকে নিয়ে বাজারে নিতে যে খরচ সেটিও পাওয়া যায় না। এতে কৃষকেরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
‘সেজন্য সরকার ইউনিয়নে মিনি কোল্ডস্টোরেজ করার কথা ভাবছে। প্রধানমন্ত্রীর কনসেপ্ট থেকে ইউনিয়নে কোল্ডস্টোরেজ করা হবে। এবং সেটি সোলার প্যানেলের মাধ্যমে রান করবে। ফলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না।
