চট্টগ্রামে বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত সহস্রাধিক
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১১৬ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে আরও ১৪১ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ১৯৮ জন, তবে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে হাসপাতালের তালিকায়, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৮ জন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ২২ জন, কক্সবাজারে ১০ জন, বান্দরবানে ১১ জন, খাগড়াছড়িতে নতুন চারজনসহ একাধিক রোগী এবং ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় মিলিয়ে ছয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, আগাম বর্ষার কারণে জুন থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নভেম্বর পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালের শতাধিক চিকিৎসক ও সিনিয়র স্টাফ নার্সকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগরের বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নগরজুড়ে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম এখন ডেঙ্গুর জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ নগরগুলোর একটি। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, জলাবদ্ধতা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও টায়ারে জমে থাকা পানি এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে রাখা পানির ট্যাংক, ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত বোতল ও ডাবের খোসা এডিস মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় চসিকের উদ্যোগ
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। চসিকের চলমান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার এবং জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার। খাল, নালা ও ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম। বাসাবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবনে সচেতনতামূলক অভিযান। ওয়ার্ডভিত্তিক মাইকিং ও প্রচারপত্র বিতরণ। হটলাইন ও অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান। স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম।
চসিকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসার ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে।
পার্বত্য জেলাগুলোতেও বাড়ছে সংক্রমণ
একসময় ডেঙ্গু মূলত বড় শহরের রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, মানুষের চলাচল বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এসব এলাকাতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গুর বিস্তার তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি এবং আক্রান্ত মানুষের চলাচল। এই তিনটির যেকোনো একটিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সংক্রমণও কমিয়ে আনা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানো যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার লার্ভা ধ্বংস করা এবং উৎসস্থল নির্মূল করা।
হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ বিভাগীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় স্যালাইন, প্লাটিলেট পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও চলমান রয়েছে।
কী করবেন নাগরিকরা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন—
সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা ও ছাদ পরিষ্কার করুন। কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেবেন না। ফুলের টব, এসির ট্রে, ড্রাম ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন। দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার বা ফুলহাতা পোশাক পরুন।
জ্বর হলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
সামনে আরও কঠিন সময়?
স্বাস্থ্য বিভাগের আশঙ্কা, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। ফলে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য বিভাগের নয়; প্রতিটি নাগরিকেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। একটি বাড়িতে যদি কোথাও পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নেয়, তবে তা পুরো মহল্লার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফরিদা|চখ
