‘অভিমানে’ একে একে ঝরছে প্রাণ
চট্টগ্রামের আকাশজুড়ে যেন বিষাদের ঘনঘটা। গত এক সপ্তাহ ধরে ভেসে আসা একের পর এক দুঃসংবাদ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। মহানগর থেকে শুরু করে পাহাড়-ঘেরা জনপদ—কোথাও যেন আজ একটুখানি প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা নেই। এই অল্প কদিনের ব্যবধানে অন্তত ৭টি অকাল আত্মহত্যার ঘটনা আর এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু এখন সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নলুয়াপাড়া। মাত্র ১৯ বছর বয়সী গৃহবধূ ইসরাত জাহান সামিয়া, যার চোখভরা ছিল কত না স্বপ্ন, সেই প্রাণটিই নিথর হয়ে পড়ে রইল শ্বশুরবাড়িতে। শনিবার সকালে যখন পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় পেলেন, তখন কি তারা জানতেন—এটাই শেষ দেখা? হাসপাতালে নেওয়ার পর যখন চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন, তখন যেন পুরো পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে অন্ধকার। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো নির্মম অধ্যায়, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে।
একই সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকার এক মসজিদের পবিত্রতা আর নীরবতার মাঝে ইমাম মোহাম্মদ আমির হোসেন (৪০)- এর ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়ার ঘটনাটি প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিয়েছে। যে মানুষটি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনিতে মানুষের কানে পরম করুণাময়ের ডাক পৌঁছে দিতেন, তিনিই কি না আজ নিজেই জীবনের মায়া ত্যাগ করলেন!
পুলিশ জানিয়েছে, তার মরদেহের পাশ থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। সেই চিরকুটের প্রতিটি অক্ষরে হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো না বলা কষ্ট, কিংবা বুকফাটা কোনো অভিমান। মৃত্যুর এই কারণ এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা, তবে তদন্তের শেষে যে সত্য বেরিয়ে আসবে, তা হয়তো আমাদের আরও ব্যথিত করবে।
অন্যদিকে, রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে উদ্ধার হলো এক স্কুল স্বপন বড়ুয়া (৫২)-এর নিথর মরদেহ। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ যেখানে নতুন জীবনের আশার প্রতীক, সেখানে এমন অকাল মৃত্যুর ঘটনা যেন একেবারেই বেমানান। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিষপানে হয়তো তিনি নিজেই নিজের জীবনের ইতি টেনেছেন, কিন্তু কেন এই চরম সিদ্ধান্ত? কী এমন পাহাড়সম কষ্ট তাকে গ্রাস করেছিল যে, তিনি এই অমোঘ পথ বেছে নিলেন? ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আর তদন্তের প্রতিটি ধাপে এখন সেই উত্তর খুঁজছে শোকসন্তপ্ত পরিবার ও এলাকাবাসী।
সাতকানিয়ার সোনাকানিয়ায় যেন এক নিস্তব্ধতার আর্তনাদ। মাত্র ২২ বছর বয়সী গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌস নয়ন, যার এক বছর বয়সী অবুঝ শিশুটির পৃথিবী আজ থমকে গেল চিরতরে। শুক্রবার সকালে শাশুড়ির সঙ্গে হাসিখুশি নাশতা করার পরই মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ—বাড়ির শান্ত পরিবেশ গ্রাস করল এক অমোঘ শোকের ছায়া। নিজের ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় নয়নের নিথর দেহ পাওয়ার দৃশ্যটি যেন কোনো মায়ের পক্ষে সহ্য করার মতো নয়। সৌদি প্রবাসী স্বামীর ঘর আর সন্তানের কোল খালি করে কেন এমন অসময়ে বিদায় নিলেন তিনি, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন আইন আর তদন্তের ওপর ভরসা করে আছে পুরো এলাকা।
বোয়ালখালীতে রুমা আক্তার সীমা (২৬) নামের আরেক গৃহবধূর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কী এমন যন্ত্রণা, কী এমন গ্লানি তাকে বাধ্য করল জীবনের মায়া ত্যাগ করতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন ময়নাতদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে তার পরিবার ও পুলিশ। নিহত সীমা শরীফপাড়ার প্রবাসী জানে আলমের স্ত্রী। তাদের সংসারের ৭ বছর বয়সী ১ ছেলে এবং ২ বছর বয়সী ১ মেয়ে রয়েছ।
এদিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা থেকে আসা খবরটি হৃদয়কে আরও ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। পৃথক ঘটনায় দুই প্রবাসী যুবক আত্মহত্যা করেছেন। তারা সম্প্রতি ঈদ উদযাপন করতে বিদেশ থেকে যারা বুকভরা আশা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, তারাই বেছে নিলেন আত্মহননের পথ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, একজন পারিবারিক কলহ এবং অন্যজন সামাজিক অপবাদের কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এসব ঘটনার মধ্যে একাধিক মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ডে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, স্বল্প সময়ে ধারাবাহিক এমন মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
পরপর এমন আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে চট্টগ্রামজুড়ে। এই অকাল মৃত্যুর মিছিল কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়; এটি আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য এক অশনি সংকেত। মানুষ যখন ক্ষোভ, অভিমান আর বিষণ্ণতার ভার সইতে না পেরে নিভৃতে হারিয়ে যায়, তখন আমরা কি তার দায় এড়াতে পারি?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ, মানসিক চাপ, সামাজিক অপবাদ এবং ব্যক্তিগত সংকট অনেক ক্ষেত্রেই এমন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদারের পাশাপাশি প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
এখন সময় এসেছে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একে অপরের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়ার। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি একে অপরের প্রতি মানবিক হওয়া। আর যেন কোনো প্রাণ অকালে ঝরে না পড়ে, এটাই আমাদের আজ একান্ত প্রার্থনা।
ফরিদা|চখ
