১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ড
চাক্তাইয়ের কান্না- মাদকের থাবা বাকলিয়ার ভাগ্যবদল করবেন কে
কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডটি যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ক্যানভাস। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের অববাহিকায় অবস্থিত এই জনপদটি একদিকে যেমন চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’, অন্যদিকে তেমনি পৌনে দুই লক্ষাধিক মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার এক জীবন্ত উপাখ্যান। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলের অলিগলিতে এখন চায়ের কাপে রাজনৈতিক ঝড়। সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা কোমর বেঁধে নেমেছেন মাঠে—কারও লক্ষ্য দলের জন্য দীর্ঘদিনের রাজপথের ত্যাগের মূল্যায়ন, আবার কারও লক্ষ্য সামাজিক ও ব্যবসায়ী নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে এই অবহেলিত জনপদকে আমূল বদলে দেওয়া।
দূর থেকে দেখলে দক্ষিণ বাকলিয়াকে আর দশটা ব্যস্ত শ্রমজীবী বসতির মতোই মনে হয়। কিন্তু এর ভেতরে প্রবেশ করলেই উন্মোচিত হয় এক রূঢ় ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এই ঘনবসতিপূর্ণ ওয়ার্ডটি এখন নানামুখী সামাজিক ও পরিবেশগত সংকটে জর্জরিত।
একসময়ের প্রমত্তা ও ঐতিহ্যবাহী ‘চাক্তাই খাল’ এখন পলিথিন আর আবর্জনার ভাগাড়। বর্জ্যের স্তর জমে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেখে মনে হবে এটি কোনো শক্ত মাঠ, যার ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে পার হওয়া যায়। ফলে, সামান্য বর্ষা বা জোয়ারের পানিতেই মিয়াখান নগর, তুলাতুলী ও চর চাক্তাইয়ের নিচু এলাকাগুলো নোংরা ও দূষিত পানিতে প্লাবিত হয়।
অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকার ঠিক পাশেই হওয়ায় ভেতরের ঘিঞ্জি ঘরগুলো ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ও অস্বাস্থ্যকর কারখানা। কোনো লাইসেন্স বা স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে এখানে তৈরি হচ্ছে ক্ষতিকর রঙ মিশ্রিত ভেজাল মসলা, মাছিভনভন পরিবেশে নিম্নমানের সেমাই এবং অনিয়ন্ত্রিত কেমিক্যালযুক্ত ‘বাংলা সাবান’।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দিনমজুর ও পোশাক শ্রমিকদের প্রধান আবাসন এই এলাকা। জীবিকার তাগিদে কাকডাকা ভোরে বাবা-মা কর্মস্থলে চলে যাওয়ায় শিশুরা অভিভাবকহীনভাবে বড় হচ্ছে। মাত্র ৪২.১০% সাক্ষরতার হারের এই ওয়ার্ডে সুনির্দিষ্ট সামাজিক তদারকি না থাকায় কিশোররা অনায়াসেই জড়িয়ে পড়ছে ‘কিশোর গ্যাং’ ও নানামুখী অপরাধে। গলির আনাচে-কানাচে বসছে মাদক ও জুয়ার আসর, যার ফলে নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
দক্ষিণ বাকলিয়ার এই পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধান আর অবহেলিত মানুষের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলের হেভিওয়েট সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
১৯ নং ওয়ার্ড বিএনপি সাবেক সভাপতি ও মহানগর বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা হাজী নবাব খান। দলের দুঃসময়ে অসংখ্য মামলা-হামলার শিকার এবং র্যাবের ক্রসফায়ারের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে রাজনীতি করা রাজপথের সৈনিক হাজী নবাব খান এবার মূল্যায়নের আশা রাখছেন। জুলাই আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই বর্ষীয়ান নেতা বলেন, “দলের জন্য জীবনের সুবর্ণ সময় বিলিয়ে দিয়েছি। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ঘরে হামলা করেছে, পুলিশ আমাকে না পেয়ে ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। সুসময়ে অনেকেই আসবে, তবে দল যেন প্রকৃত ত্যাগীদের ভুলে না যায়।” তার রূপরেখা, নির্বাচিত হলে তিনি পুরো ওয়ার্ডকে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেন। মাদক ব্যবসার আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া, নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে যুক্ত করা, পুরুষদের বেকারত্ব লাঘবে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং বস্তির শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করাই তার মূল লক্ষ্য।
ইয়াসিন চৌধুরী আশু (যুগ্ম আহ্বায়ক, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি)। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে আসা ইয়াসিন চৌধুরী আশু মানুষের ভালোবাসাকে পুঁজি করে কাউন্সিলর পদের দৌড়ে নেমেছেন। তিনি বলেন, “এলাকার মানুষ আমাকে যে ভালোবাসে, তা কেবল আবেগ নয়, এটি আমার জন্য এক বিশাল দায়িত্ববোধ। এই দায়িত্ববোধই আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।” তার রূপরেখা, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি প্রতিটি শিশুর মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করবেন এবং একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে মাদক, জুয়া ও কিশোর গ্যাং পুরোপুরি ধ্বংস করতে চান।
চৌধুরী মোহাম্মদ মইনুদ্দিন পারবেজ (যুগ্ম আহ্বায়ক, ওয়ার্ড বিএনপি)। ১ লক্ষ ৪২ হাজারের বেশি নাগরিকের এই ওয়ার্ডে শিক্ষার নিম্ন হার নিয়ে ভীষণ চিন্তিত চৌধুরী মোহাম্মদ মইনুদ্দিন পারবেজ। তিনি সরাসরি ও কৌশলী সমাধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের এখানে শিক্ষার হার চসিকের অন্য ওয়ার্ডের চেয়ে কম। আমার মূল জোর থাকবে শিক্ষার ওপর, যেন প্রতিটি শিশু অন্তত মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারে।” তার রূপরেখা, কাউন্সিলর কার্যালয়ের নাগরিক সেবা (জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ইত্যাদি) শতভাগ হয়রানিমুক্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমান মেয়রের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তারাই মাদক ছড়িয়েছে। তাই সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে মাদক ও ইভটিজিং নির্মূল করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করবেন।
মো. ফরিদ উদ্দিন (যুগ্ম সম্পাদক, টেরীবাজার ব্যবসায়ী সমিতি ও অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক, চসিক শপ ওনার্স এসোসিয়েশন)। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা এবং পলোগ্রাউন্ড বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. ফরিদ উদ্দিন মনে করেন, মানুষের জন্য কাজ করতে শুধু পদের প্রয়োজন হয় না, তবে ক্ষমতায় থাকলে কাজের আইনি ও যৌক্তিক গতি বাড়ে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ বাকলিয়ার বস্তিগুলোর পরিবেশ খুবই নাজুক। এখানকার অবহেলিত ও নিম্নআয়ের মানুষগুলোরও সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।” তার রূপরেখা, সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে বস্তিবাসী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা। এছাড়াও সমাজের অর্ধাংশ নারীদের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া, নারী-শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করে অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত করতে চান তিনি।
দক্ষিণ বাকলিয়ার সাধারণ ভোটাররা এবার আর শুধু নির্বাচনী ফাঁকা বুলি বা সাময়িক আশ্বাসে ভুলতে রাজি নন। চাক্তাই ও শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন হওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের দাবি একটাই যিনি ঐতিহ্যবাহী চাক্তাই খালের যৌবন ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতা দূর করবেন, ভেজাল কারখানা উচ্ছেদ করবেন এবং এলাকাকে মাদকমুক্ত করে নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ করতে পারবেন দল-মত নির্বিশেষে তাঁকেই তারা আগামী দিনের প্রতিনিধি হিসেবে বা ওয়ার্ডের অভিভাবক হিসেবে বেছে নেবেন।