এলিট ওয়ার্ডে ‘সিটিজেন চার্টার’, কেমন বাঘমনিরাম চান সম্ভাব্য কাউন্সিলররা?
চট্টগ্রাম নগরীর বুকে এক টুকরো অভিজাত আর ঝলমলে জনপদের নাম ১৫ নম্বর বাঘমনিরাম ওয়ার্ড। একদিকে শতবর্ষী গাছের শীতল ছায়ায় ঘেরা নান্দনিক সিআরবি, অন্যদিকে পাঁচতারকা হোটেলের জৌলুস, নামী শপিং মল আর উচ্চবিত্ত ও এলিট শ্রেণির মানুষের বসবাস। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মতো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু যেমন এই ওয়ার্ডে, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক আসকার দিঘি আর চট্টেশ্বরী কালী মন্দির। প্রায় ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত ২ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটারের এই চমৎকার ওয়ার্ডটি যেন এক টুকরো আদর্শ নগরী।
তবে এই ঝকঝকে অবয়বের আড়ালেও রয়েছে কিছু নাগরিক ক্ষত। চকবাজার, দামপাড়া ও কাজীর দেউড়ির তীব্র যানজট, বর্ষায় আসকার দিঘির পাড় বা ব্যাটারি গলির জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি আর শব্দদূষণ এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মিশ্র আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এই এলিট ওয়ার্ডের ভাগ্যবদলে প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি, আঁকছেন নতুন এক বাঘমনিরামের রূপরেখা।
এখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে আলোচনায় রয়েছেন তরুণ প্রার্থী তাওসিফ সুলতান রাফি। অন্যদিকে, বিএনপি থেকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সক্রিয় আছেন চৌধুরী সাইফুদ্দিন রাশেদ ছিদ্দিক, শহিদুল ইসলাম চৌধুরী এবং মোহাম্মদ ইদ্রিস।
দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনীতির মাঠে ত্যাগ ও লড়াইয়ের এক পরীক্ষিত নাম ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক চৌধুরী সাইফুদ্দিন রাশেদ ছিদ্দিক। দুঃসময়ে তিন-তিনবার দলের পক্ষে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে লড়া এই নেতা নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ। তবে বাঘমনিরামের উন্নয়নে তাঁর চিন্তা-ভাবনা অত্যন্ত আধুনিক ও দূরদর্শী।
কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে তিনি বাঘমনিরামকে একটি ‘স্বনির্ভর ওয়ার্ড’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তাঁর পরিকল্পনার মূল দিকগুলো হলো, রাত ২টা-৩টাতেও যেন নাগরিকেরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য পর্যাপ্ত আধুনিক সড়কবাতি ও শক্তিশালী ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা। ওয়ার্ডের নিজস্ব সম্পদ ও জনশক্তি ব্যবহার করে ছোট-মাঝারি আয়ের উৎস তৈরি করা, যা ওয়ার্ডের নিজস্ব উন্নয়ন তহবিলে অবদান রাখবে। সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘স্থানীয় উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধ এবং প্রকৃত অভাবীদের মাঝে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে তরুণদের মাঠমুখী করতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নেওয়া।
চৌধুরী সাইফুদ্দিন রাশেদ ছিদ্দিক বলেন, “আমি তৃণমূলের মানুষ। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সরাসরি নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোই আমার লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই আমি আমার ওয়ার্ডের সব জানা-অজানা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে চাই।”
চট্টগ্রাম নগর যুবদলের সাবেক সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ও মহানগর আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহসভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস এই ওয়ার্ডটিকে দেখেন এক বিপুল সম্ভাবনার চোখ দিয়ে। তবে অতীতের নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, অতীতে এই ওয়ার্ডে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ছিল, যা তরুণদের বিপথগামী করেছে এবং বেকারত্ব বাড়িয়েছে।
নির্বাচিত হলে তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে দুটি পরিচ্ছন্নতা এবং বেকারত্ব দূরীকরণ। তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভাবনায় রয়েছে, বাঘমনিরামেই রয়েছে শহরের পাঁচতারকা হোটেল, বড় বড় হাসপাতাল ও নামী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। শিক্ষিত বেকার যুবকদের দক্ষ করে গড়ে তুলে এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সিটি করপোরেশনের যেসব কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মশালা রয়েছে, সেগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনে নিজেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সুপারিশ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “আমার ওয়ার্ডটি একটি এলিট ওয়ার্ড। একে সাজানোর সব উপাদান এখানে আছে। শুধু দরকার সঠিক সমন্বয় ও তরুণদের সঠিক পথ দেখানো।”
জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী তাওসিফ সুলতান রাফি বলেন, “আমি এমন এক আদর্শিক সংগঠনের কর্মী যেখানে কেউ নিজে থেকে প্রার্থী হতে পারে না। সংগঠন জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়। বাগমনিরামের জনগণ বিশ্বাস করেন, আমি নির্বাচিত হলে তাদের অধিকার ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে। আমি মনে করি, জনপ্রতিনিধি জনগণের শাসক নন, বরং সেবক। জনগণের প্রত্যাশা ও জবাবদিহিমূলক একটি জনবান্ধব আধুনিক ওয়ার্ড গড়ে তুলতেই আমার সংগঠন আমাকে মনোনীত করেছে।
আমাদের ১৫ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ডের প্রধান তিনটি সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তা ও গলিসহ নাগরিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। দীর্ঘদিনেও এই সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়ার পেছনে কার্যকর উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি ছিল। জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বাস্তবসম্মত কাজ করা হলে এই ভোগান্তি থাকত না।
আমি নির্বাচিত হলে জরুরি ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা ও তীব্র যানজট নিরসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব। কারণ সামান্য বৃষ্টি আর যানজটে মানুষের জীবন থমকে গেলে সব উন্নয়নই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
আগামী পাঁচ বছরে আমি বাগমনিরামকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, জলাবদ্ধতা ও যানজটমুক্ত আদর্শ ‘মডেল ওয়ার্ড’ হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান এবং সেবা হবে সহজলভ্য। যুবসমাজের জন্য থাকবে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আর প্রবীণদের জন্য থাকবে সম্মান। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে আমি প্রতিনিধি নয়, তাদের প্রকৃত সেবক হয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।”
এদিকে নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণায় পিছিয়ে নেই বিএনপি থেকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক শিল্পবিষয়ক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনিও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের জন্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উন্নয়ন ও পরিবর্তনের একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে তিনিও প্রতিদিন চষে বেড়াচ্ছেন ওয়ার্ডের অলিগলি। তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির জোয়ার বইলেও সচেতন ভোটাররা কিন্তু বেশ হিসাব-নিকাশ করছেন। ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ব্যাংকার শাহ নেওয়াজ খন্দকার নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, “আমাদের ওয়ার্ডের জন্য যেনতেন প্রতিনিধি আমরা চাই না। আমরা চাই এমন একজন প্রার্থী, যিনি শিক্ষিত, সৎ, কর্মঠ এবং ওয়ার্ডপ্রেমী। এখানে বড় কোনো সমস্যা নেই, তবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি রয়েছে। আমরা এমন প্রার্থীকেই ভোট দেব, যিনি বাসিন্দাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে মনে হবে। আমাদের সন্তানরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেন আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারে, চুরি-রাহাজানি যেন না হয় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
একাধিক ভোটারের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, বাঘমনিরামের সাধারণ ভোটাররা এবার কেবল কথার ফুলঝুরি শুনতে চান না। তাঁরা চান নির্বাচনের পর যেন ড্রেনেজ ব্যবস্থার সত্যি উন্নয়ন ঘটে, যানজটের জটলা খোলে এবং একটি শান্তিময় পরিবেশ বজায় থাকে।
একটি আধুনিক ও মডেল ওয়ার্ডের দাবি নিয়ে প্রার্থীরা যখন দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, তখন দেখার বিষয় একটাই জামায়াত ও বিএনপির এই একঝাঁক হেভিওয়েট ও তরুণ সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে কার ‘সিটিজেন চার্টার’ বা নাগরিক সনদের ওপর শেষ পর্যন্ত আস্থা রাখেন বাঘমনিরামের সচেতন নাগরিকেরা।
